দারুল ইসলামের সংজ্ঞা ও পরিচয়  

 

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বলেন, “দারুল ইসলাম— এমন ভূমি, যা মুসলমানদের শাসনাধীন। যেখানে ইসলামের আহকাম ও বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত এবং সেখানে মুসলমানরা নিরাপত্তার সাথে বসবাস করে। (হাকিম শহিদ রহ. ‘আলকাফি’ গ্রন্থে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. থেকে এই সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন।) সেই ভূমিরা অধিবাসীরা সকলেই মুসলমান, কিবা সকলেই ইসলামের শাসনব্যবস্থা মান্যকারী অমুসলিম (যিম্মি) কিবা উভয় গোষ্ঠীরই উপস্থিতি— এর সবই সমান; সর্বাবস্থায়ই তা দারুল ইসলাম।

ইসলাম আসার আগে তো আর দারুল ইসলাম বলতে কিছু ছিলো না। সব ছিলো দারুল হারব। তো এই দারুল হারব কীভাবে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়— আসুন, সে বিষয়টা জেনে নেই। ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর ‘আসসিয়ারুল কাবির’ এবং সারাখসি রহ. প্রণীত তার ব্যাখ্যাগ্রন্থের আলোকে প্রতিভাত হয়— দারুল হারব তিনভাবে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়।

১. দারুল হারবের কোনো শহরের অধিবাসীরা যদি ইসলাম গ্রহণ করে নিজেদের শহরেই অবস্থান করে, তবে তাদের ইসলাম গ্রহণের সময় থেকে তা দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। [শরহুস সিয়ারিল কাবির, সারাখসি— ১/২৪৯-২৫০]

তেমনি যদি মুশরিকরা তা বিজয় করে নেয় এরপর মুসলমানরা পুনরায় তা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, এবং মুশরিকরাও সেখান থেকে বিতাড়িত হয়, আর মুসলমানরাও সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, তবে তা দারুল ইসলাম হিসেবেই পরিগণিত হবে। কেননা যখন মুশরিকরা তার কবজা নিয়ে নিয়েছিলো, তখন তা দারুল হারব হয়ে গিয়েছিলো। এরপর যখন মুসলমানরা তা বিজয় করে নিলো এবং সেখানে বসবাসের সংকল্প করলো, তখন পুনরায় তা দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়েছে। [প্রাগুক্ত; আলআহকামুস সুলতানিয়া, মাওয়ারদি— ১৩৭]

২. দারুল হারবের কোনো ভূমি বিজয় এবং তার ওপর ইসলামের বিধিবিধান বাস্তবায়নের ঘোষণার মাধ্যমেও দেশ দারুল ইসলাম হয়। সারাখসি রহ. বলেন, “মুসলমানরা যদি শত্রুদের কোনো ভূমি বিজয় করে এবং তাদের পূর্ণ দখলে আসে, হারবি অধিবাসীরা পলায়ন করে, তবে ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করার দ্বারা তা দারুল ইসলাম হয়ে যাবে।”

আল্লামা হাসকাফি রহ. বলেন, “এ বিষয়ে কোনো মতবিরোধ নেই যে, ইসলামের কিছু আহকাম-বিধান প্রতিষ্ঠা করার দ্বারাই দারুল হারব দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে।’’ [আদদুররুল মুনতাকা শরহুল মুলতাকা— ১/৬৩৮]

বোঝা গেলো, ইসলামি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত না হলে শুধু দেশ বিজয়ের দ্বারাই তা দারুল ইসলাম হিসেবে গণ্য হবে না। তেমনি হারবিরা পূর্ণরূপে বিতাড়িত না হলে, তাদের ক্ষমতা-প্রতাপ পরিপূর্ণ বিদূরিত না হলে তা দারুল ইসলাম হিসেবে গণ্য হবে না। কেননা ইসলামি ভূমি হওয়ার জন্য প্রথমে কুফরের মূলোৎপাটন জরুরি। [শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৩/১০০৪-১০০৬, ৪/১২৫৩, ১২৫৭; আলমাবসুত— ১০/২৩, ১১৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া— ২/২৩২; ফাতাওয়া বাযযাযিয়া (হিন্দিয়ার ষষ্ঠ খণ্ডের টীকায়)— ৩/৩১১-৩১২]

সারাখসি রহ. এর কথায় ফিরে যাই। এরপর তিনি বলছেন, “মুসলমানদের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দ্বারা দেশ দারুল ইসলাম হয়ে যাবে। মুশরিকদের ওপর মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে তারা ‘যিম্মি’ বলে গণ্য হবে।” (আর হারবি থাকবে না।)।

[শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৫/২১৬, ২১৯১, ২১৯৭; আলমাবসুত— ১০/২৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া— ২/২৩২; আদদুররুল মুখতার— ৪/১৭৫; আদদুররুল মুনতাকা— ১/৬৩৪; রাওযাতুত তালিবিন— ৫/৪৩৩; তুহফাতুল মুহতাজ— ৯/২৬৯]

বোঝা গেলো, কোনো দেশ দারুল ইসলাম হতে পারে; যদিও তার সকল নাগরিক অমুসলিম হয়। কেননা তাতে ইসলামের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। নাগরিকরা অমুসলিম হলেও রাষ্ট্র ইসলামি শাসনক্ষমতার অধীন রয়েছে। তেমনই কোনো দেশ দারুল হারব হতে পারে; যদিও তার অধিকাংশ নাগরিক মুসলিম হয়। কেননা তাতে কুফরের শাসন ও বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। নাগরিকরা মুসলিম হলেও রাষ্ট্র কুফরি শাসনক্ষমতার অধীন রয়েছে।

এজন্যই ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বলেন, “যদি মুসলমানদের কোনো সৈন্যদল দারুল হারবে প্রবেশ করে এবং খলিফার পক্ষ থেকে নির্ধারিত কোনো আমিরের তত্ত্বাবধানে তারা থাকে, তখন তারা দারুল হারবের কোনো শহরে ঢুকে তাদের সামনে ইসলাম উপস্থাপন করে, আর তারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন মুসলিম সৈন্যদল তাদেরকে জিযয়া প্রদান করতে নির্দেশ দেয়, আর তারাও এ আহ্বান মেনে নেয়…এবং তারা বলে, তোমরা আমাদেরকে এই ‘আহদ’ দাও যে, আমরা স্থায়ীভাবে এই ভূমিতেই থাকবো। এরপর যতোক্ষণ মুসলমানরা তাদের সঙ্গে বাস করবে, তারা হারবিদের ওপর শক্তিশালী এবং হারবিরাও তাদের থেকে নিবৃত্ত থাকবে, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই যে, আমির তাদেরকে ‘যিম্মি’ বানিয়ে নিবে এবং তাদের ওপর একজন আমির নির্ধারণ করে দিবে, যিনি তাদের ওপর ইসলামের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করবেন, তাদের ওপর ইসলামের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার দ্বারাই তারা ‘যিম্মি’ এবং দেশ দারুল ইসলাম হিসেবে সাব্যস্ত হবে।…যদি মুসলমানরা যিম্মিদের সহযোগিতা ছাড়া ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম না হয়, তবে আমির তাদের ‘যিম্মা’ চুক্তি গ্রহণ করবেন না। কেননা যখন যিম্মিদের সাহায্য-সন্তুষ্টি ছাড়া মুসলমানরা ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম না হবে, তখন আদতে ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করছে যিম্মিরা; (মুসলমানরা নয়) অথচ ইসলামের বিধিবিধান প্রয়োগ করবে একমাত্র মুসলিমরা।” [আসসিয়ারুল কাবির মা’আ শরহিস সারাখসি— ৫/২১৯১-২১৯৩; মাজমাউল আনহুর— ১/৬৫৯; আহকামুদ দিয়ার— ১৮-২০;]

এর আলোকে বলা যায়, যেসব দেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা নেই, যদিও তাতে মুসলমানরা ওয়াজ-মাহফিল, ইদ-জামাআত ইত্যাদি আদায় করতে পারে, তা দারুল ইসলাম হিসেবে পরিগণিত হবে না। [মাজাল্লাতুল কানুন ওয়াল ইকতিছাদ, যিলহজ সংখ্যা, ১৩৫৪ হিজরি, পৃ. ২০৩, তা’লিক- ১]

৩. ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বলেন, যদি যিম্মিরা তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমানদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে তাদেরকে পরাজিত করে দারুল ইসলামের দখল নিয়ে নেয়, তবে তাদের শাসন চলতে পারে, যদি মুসলমানরা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে সেখানে বাস করতে পারে। কেননা এক্ষেত্রে তা দারুল হারব হয়ে যায়নি। দেখছো না, মুসলমানরা সেখানে নিরাপদ! এটা আদতে দারুল ইসলামই, যদিও আজ তার এই অবস্থা। [কিতাবুল আসল, সিয়ার অধ্যায়, ইমাম মুহাম্মাদ— ২১৭]

আল্লামা সারাখসি রহ. বলছেন, যেখানে মুসলমানরা নিরাপত্তার সাথে বাস করতে পারে না, তা দারুল হারবের অন্তর্ভুক্ত। কেননা দারুল ইসলাম সেই ভূখণ্ড, যা মুসলমানদের হাতে রয়েছে। আর এর বাহ্যিক আলামাতই হলো মুসলমানদের যথাযোগ্য নিরাপত্তা। [শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৪/১২৫৩; আলমাবসুত— ১০/৯৩, ১১৪]

হাকিম শহিদ রহ. বলেন, “দারুল ইসলাম তা, যাতে মুসলমানদের শাসকের ক্ষমতা চলে।”

দারুল ইসলাম সম্পর্কে আরো জানতে দেখুন— বাদায়িউস সানায়ি— ৯/৪৩৭৪; আদদুররুল মুনতাকা— ১/৬৩৪; কাশশাফ— ২/২৫৬; আলকুল্লিয়্যাত, কাফাবি— ২/৩৪১; আলমুকাদ্দিমাতুল মুমাহহিদাত— ২/১৫৩; উসুলুদ দীন— ২৭০; নিহায়াতুল মুহতাজ— ৮/৮২; আসনাল মাতালিব— ৪/২০৪; আলমু’তামাদ ফি উসুলিদ দীন— ২৭৬; আহকামু আহলিয যিম্মাহ— ১/৫; আততাশরিউল জিনায়ি— ১/২৭৫-২৭৬]

 

 

দারুল হারবের পরিচয়

 

দারুল হারব— মানে যুদ্ধবিদ্ধস্ত বা যুদ্ধে লিপ্ত রাষ্ট্র নয়। অনেকে ভাবেন, দারুল হারব শুধু এমন রাষ্ট্রকেই বলা হয়, যা কোনো মুসলিম ভূখণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। বাস্তবে বিষয়টা এমন নয়। কোনো ভূখণ্ডে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলে তাকে দারুল ইসলাম বলা হয় আর কোথাও কুফরি এবং শিরকি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলে তাকে দারুল হারব বলা হয়। দারুল হারবকে অন্য শব্দে— দারুল কুফর, দারুশ শিরক ইত্যাদিও বলা হয়। এসব পরিভাষার মাঝে কোনো বিরোধ নেই। ফকিহগণ দারুল হারবের যে সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন, তার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বিষয়টা অস্পষ্ট থাকার কথা নয়। এজন্যই সারাখসি রহ. বলেন, “দারকে আমাদের দিকে বা তাদের দিকে নিসবত করাটা মূলত ক্ষমতা এবং প্রাধান্যতার বিচারে।’’ [আলমাবসুত, সারাখসি— ১০/১১৪]

এ বিষয়টাকেই আল্লামা কাসানি রহ. আরো বিস্তারিত করে এভাবে বলেছেন, “কোনো রাষ্ট্রে কুফরের আহকাম-বিধিবিধান প্রকাশিত হলে তা দারুল কুফর হয়ে যায়। … রাষ্ট্র শুধু কুফরের বিধানাবলী প্রকাশিত হওয়ার দ্বারাই দারুল কুফর বলে গণ্য হয়।” [বাদায়িউস সানায়ি— ৯/৪৩৭৫; আরো দেখুন— আহকামুদ দিয়ার, আবিদ সুফয়ানি— ১৫]

বোঝা গেলো, কোনো রাষ্ট্র দারুল হারব (অন্য শব্দে— দারুল কুফর, দারুশ শিরক) হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য লড়াই-যুদ্ধ চলমান থাকা অপরিহার্য নয়। এজন্যই হাম্বলি ফকিহগণ বলেন, “হারবি শব্দটা হারবের দিকে সম্পর্কিত। হারব অর্থ— কিতাল (লড়াই), তেমনি এর অর্থ দূরত্ব এবং বিদ্বেষও। তো দারুল হারব অর্থ হলো এমন রাষ্ট্র, যার সাথে মুসলমানদের দূরত্ব কিবা মুসলমানদের প্রতি রয়েছে যার বিদ্বেষ। হারবিকে হারবি এই দ্বিতীয় অর্থ, তথা দূরত্ব এবং বিদ্বেষ— এর বিচারেই বলা হয়। কার্যত যুদ্ধে লিপ্ত থাকা জরুরি নয়। [আলমুতলি’ আলা আবওয়াবিল মুকনি’, বা’লি— ২২৬]

 

দারুল হারবের সংজ্ঞা

 

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বলেন, “দারুল হারব এমন ভূখণ্ড, যেখানে শিরকের বিধিবিধান প্রকাশিত এবং যার ওপর হারবিদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত।” [আসসিয়ারুল কাবির মা’আ শারহিস সারাখসি— ১/২৫১; ৪/২০৭০, ২১৯৭; আলমাবসুত— ১০/১১৪; বাদায়িউস সানায়ি— ৯/৪৩৭৫; আদদুররুল মুনতাকা— ১/৬৩৪; মাজমাউল আনহুর— ১/৬৫৯]

এজন্যই তিনি বলেন, “দারুল হারবের কোনো রাষ্ট্রের সাথে যদি মুসলমানরা এ মর্মে চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে, সেখানে তারা ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত করবে না, তবে তা দারুল হারব (-ই থেকে যাবে)।” সারাখসি রহ. এর ইল্লত (কারণ) বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, “কেননা কোনো ভূখণ্ড দারুল ইসলাম হিসেবে গণ্য হয় সেখানে ইসলামের বিধিবিধান প্রয়োগ করার দ্বারা। উল্লিখিত ভূখণ্ডে তো মুসলমানদের বিধানাবলী প্রয়োগ করা হয়নি। তাই তা দারুল হারব থাকবে।” তিনি বলেন, “দারুল হারব তা-ই— যেখানে কাফিরদের বিধান চলে।” [শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৫/২১৬৫; আলমাবসুত— ১০/১১৪]

তিনি আরো বলেন, “যে স্থানে মুসলমানরা নিজেদের ব্যাপারে নিরাপদ নয়, তা দারুল হারব। কেননা দারুল ইসলাম তা-ই, যা মুসলমানদের শাসনাধীন। আর এর বাহ্যিক নিদর্শন হচ্ছে, সেখানে মুসলমানরা নিরাপদে বাস করে।” [শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৪/১২৫৩]

এজন্যই অনেক হানাফি ফকিহ এভাবে বলেছেন, “দারুল হারব তা, যেখানে কোনো কাফির রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দেশ চলে কিবা যেখানকার মুসলমানরা কাফিরদের ভয়ে ভীত থাকে।” [আদদুররুল মুনতাকা— ১/৬৩৪; কাশশাফুল ইসতিলাহাত— ২/২৫৬; আলকুল্লিয়্যাত— ২/৩৪১]

জমহুর ফকিহগণ দারুল হারবের সংজ্ঞা এভাবেই দিয়েছেন। ইমাম মালিক রহ. বলছেন— “মক্কা সেসময়ে দারুল হারব ছিলো; কেননা সেখানে তখন জাহিলিয়্যাতের বিধান কার্যকর ছিলো।” [আলমুদাওয়ানা, রিওয়ায়াতু সুহনুন— ২/২২]

মালেকি, শাফেয়ি, হাম্বলি— সবার বক্তব্য প্রায় একই ধরনের। [দেখুন— প্রাগুক্ত; আলমুকাদ্দিমাতুল মুমাহহিদাত— ২/১৫১; ফাতাওয়াশ শায়খ আলিশ— ১/৩৭৭; উসুলুদ দীন, বাগদাদি— ২৭০; আলইকনা’ মাআ কাশশাফিল কিনা’— ৩/৩৮; আলমুকনি’ মাআল ইনসাফ— ৪/১২১; আলমুবদি’— ৩/৩১৩; আলফুরু’— ৬/১৯৭; আলআদাবুশ শারইয়্যাহ, ইবনে মুফলিহ— ১/২১৩]

মুতাআখখিরিনদের মধ্যে উস্তাদ আব্দুল কাদির আওদা সুন্দর লিখেছেন, “দারুল হারব প্রত্যেক এমন অনৈসলামিক রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা মুসলমানদের শাসনব্যবস্থার অধীনে প্রবেশ করেনি, কিবা যেখানে ইসলামের বিধান প্রকাশিত নয়। এ রাষ্ট্রগুলো একই সরকারের পরিচালনাধীন থাক কিবা ভিন্ন ভিন্ন সরকারের— সবই সমান। তার স্থায়ী নাগরিকদের মাঝে মুসলমানরা থাকা বা না থাকা সবই সমান; যতোদিন তারা ইসলামের বিধান প্রতিষ্ঠিত করতে অক্ষম থাকে।” [আততাশরিউল জিনায়িল ইসলামি— ১/২৭৭]

 

হারবির পরিচয়

 

অনেকের ধারণা, হারবি তাকেই বলে, যে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। শব্দ থেকেও অনেকটা এ সংশয় হয়। তবে ফকিহগণের পরিভাষায় হারবি তিন শ্রেণি—

১. যারা বাস্তবে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে যারা পৃথিবী থেকে বিতাড়িত করার প্রয়াসে সর্বদা তৎপর।

২. যারা বিভিন্নভাবে মুসলমানদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে রেখেছে। তাদেরকে হয়রানি করে। জান-মাল-সম্ভ্রম লুট করে। অর্থনৈতিকভাবে মুসলমানদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাখে। কিবা মুসলমানদেরকে তাদের দীন থেকে ফেরানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত। অথবা যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত, তাদেরকে সহযোগিতা প্রদান করে।

৩. যারা মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধেও লিপ্ত নয়, যারা যুদ্ধে লিপ্ত তাদেরও সহযোগী নয়, কিন্তু মুসলমানদের সঙ্গে তাদের কোনোপ্রকার ‘আহদ’ নেই।

উপরিউক্ত তিনও শ্রেণিই ফকিহগণের পরিভাষায় হারবি। হারবি হওয়ার জন্য হারবে (যুদ্ধে) লিপ্ত থাকা আবশ্যক নয়।

বাদায়িউস সানায়িঃ ৯/৪৩৭৫; আলমিসবাহুল মুনিরঃ ১/১২৭; আদদুররুন নাকি ফি শরহি আলফাযিল খিরাকি, ইবনে আব্দিল হাদিঃ ৩/৭৪৪; আদদুরারুস সানিয়্যাহ ফিল আজওয়িবাতিন নাজদিয়্যাহঃ ৭/৩৯৭; আলইসতিআনা বি গাইরিল মুসলিমিনঃ ১৩২; উসুলুল আলাকাতিদ দুওয়ালিয়্যাহঃ ৩১৩।

 

দারুল ইসলাম কীভাবে দারুল হারবে রূপান্তরিত হয়?

 

 

ওপরে আমরা আলোচনা করেছি, দারুল হারব কীভাবে দারুল ইসলামে পরিণত হয়। সেখানে আমরা বলে এসেছি, কোনো ভূখণ্ডে ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করার দ্বারাই তা দারুল ইসলামে পরিণত হয়ে যায়। আর এটাই উম্মাহর সর্বসম্মত মত। [দেখুন— বাদায়িউস সানায়ি— ৯/৪৩৭৪; আদদুররুল মুনতাকা— ১৬৩৪; আলফাতাওয়াল বাযযাযিয়া— ৩/৩১২; আলফাতয়াল হিন্দিয়া— ২/২৩২]

আজকের এ লেখায় আমরা আলোচনা করবো, দারুল ইসলাম পুনরায় কীভাবে দারুল হারবে রূপান্তরিত হয়। তার আগে আমরা জেনে নেই, দারুল ইসলামের ওপর আপতিত অবস্থা মৌলিকভাবে তিন ধরনের।

১. হারবিরা কোনো ইসলামি ভূখণ্ড দখল করে সেখানে তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছে।

২. কোনো ইসলামি রাষ্ট্রের নাগরিকরা মুরতাদ হয়ে নিজেদের শহরের ওপর দখলারোপ করেছে এবং সেখানে কুফরি শিরকি বিধান প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৩. ইসলামি রাষ্ট্রের ‘যিম্মি’রা তাদের ‘যিম্মা চুক্তি’ ভঙ্গ করে কোনো দেশ বা শহরের ওপর নিজেদের প্রভাব ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছে।

[বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন— কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মাদ, কিতাবুস সিয়ার— ২১৭-২২০; শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৫/১৯১৪, ১৯৪১; আলজামিউস সগির— ২৪৯; আলমাবসুত— ১০/১১৩-১১৪; বাদাইউস সানায়ি’— ৯/৪৩৭৬; মুখতাসারুত তহাবি— ২৯৪; আলফাতাওয়াল হিন্দিয়া— ২/২৩২; ফাতাওয়া কাজিখান— ৩/৫৮৪; ফাতাওয়া শামি— ৪/১৭৪; আলবাহরুর রায়িক— ৩/২৩০-২৩১; আলফুরুক, কারাবিসি— ১/৩৪০; আলআহকামুস সুলতানিয়া, মাওয়ারদি— ১৩৮; আলিফসাহ, ইবনে হুবায়রা— ২/২২৯-২৩০; রহমাতুল উম্মাহ, দিমাশকি— ৩৫২]

এবার আমরা উম্মাহর ফকিহগণের বক্তব্য দেখি। তারা এক্ষেত্রে কী অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

আলোচিত মাসআলায় আমরা উম্মাহর ফকিহগণের দু’ধরনের বক্তব্য পাই। আরো স্পষ্ট করে বললে, আলোচিত মাসআলায় ইমামগণের দু’মাযহাব। প্রথম মাযহাব তিন ইমাম— অর্থাৎ, ইমাম মালিক রহ., ইমাম শাফেয়ি রহ. ও ইমাম আহমদ রহ. এবং সাহেবাইন— অর্থাৎ, ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর। আর দ্বিতীয় মাযহাব শুধু ইমাম আবু হানিফা রহ. এর। প্রথমে আমরা সবিস্তারে উভয় মাযহাব উল্লেখ করছি।

 

প্রথম মাযহাব

 

প্রথম মাযহাব— কোনো ভূখণ্ড তখন দারুল হারব বলে গণ্য হয়, যখন সেখানে কুফরি বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়। চাই তা দারুল হারবের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হোক কিংবা দারুল হারবের সাথে তার প্রতিবেশিত্ব-সংলগ্নতা না থাক, তার মুসলমান কিবা যিম্মি নাগরিকরা পূর্বের নিরাপত্তার অন্তর্ভুক্ত থাক কিবা না— সর্বাবস্থায় তা দারুল হারব হিসেবে গণ্য হবে।

বিগত লেখায় আমরা আল্লামা সারাখসি রহ. এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছি— দারকে মুসলমানদের দিকে অথবা কাফিরদের দিকে নিসবত করাটা মূলত ক্ষমতা এবং প্রাধান্যতার বিচারে। তাই প্রত্যেক এমন ভূখণ্ড, যেখানে শিরকের বিধান প্রকাশিত, সেখানে শক্তি ও ক্ষমতা মুশরিকদের হাতে। তাই তা দারুল হারব। আর প্রত্যেক এমন স্থান, যেখানে ইসলামের বিধান প্রতিষ্ঠিত, সেখানে শক্তি ও ক্ষমতা মুসলমানদের হাতে। তাই তা দারুল ইসলাম।

[সাহিবাইনের মাযহাব জানার জন্য দেখুন— শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৫/১৯১৪; কিতাবুল আসল, কিতাবুস সিয়ার— ২১৭; আলমাবসুত— ১০/১১৪; জামিউল ফুসুলাইন— ১/১৩; ফাতাওয়া কাজিখান— ৩/৫৮৪; আলফাতাওয়াল বাযযাযিয়া— ৩/৩১১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া— ২/২৩২; ফাতাওয়া শামি— ৪/১৭৪-১৭৫; আদদুররুল মুনতাকা— ১/৬৩৪; মুলতাকাল আবহুর— ১/৬৫৯-৬৬০; জামিউর রুমুযের হাওয়ালায় কাশশাফুল ইসতিলাহাত— ২/২৫৬; ফিকহুল মুলুক— ১/৪৬২-৪৬৩]

[অন্যান্য ইমামগণের মাযহাব জানতে দেখুন— আলমুদাওয়ানা— ২/২২; আলমুকাদ্দিমাতুল মুমাহহিদাত— ২/১৫১; ফাতাওয়াশ শায়খ আলিশ— ১/৩৭৭; আলমুগনি— ৬/৪০৩-৪০৪; আলইনসাফ— ৪/১২১; কাশশাফুল কিনা’— ৩/৩৮; আলইফসাহ— ২/২৩০; রহমাতুল উম্মাহ— ৩৫২; আহকামুদ দিয়ার, ড. আবিদ সুফয়ানি— ৪৩]

 

প্রথম মাযহাবের প্রমাণ

 

১. এই মাসআলাকে মূলত দারুল হারব দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হওয়ার মাসআলার ওপরে কিয়াস করা হয়েছে। (বিস্তারিত জানতে পূর্বের পোস্ট দ্রষ্টব্য)। যেমনিভাবে ইসলামি বিধান প্রতিষ্ঠা করার দ্বারা দারুল হারব দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়; যদিও সেখানে কাফিরদের অবস্থান রয়ে যায় এবং তা ইসলামি রাষ্ট্র সংলগ্ন না হয়— অর্থাৎ তার পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র দারুল ইসলাম না হয়ে অন্য কোনো দারুল হারব হয়, তবুও সবার মতেই তা দারুল ইসলাম হিসেবেই গণ্য হয়, তেমনিভাবে দারুল ইসলামেও যখন কুফরি বিধান প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন সেখানে মুসলমান থাকলেও এবং পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র দারুল ইসলাম হলেও তা দারুল হারব হিসেবেই গণ্য হবে। (মুজমা’অ আলাইহি মাসআলার ওপর কিয়াস)। [প্রাগুক্ত]

২. আল্লামা কাসানি রহ. বলেন, “এর ইল্লত হলো, আমাদের দারুল ইসলাম এবং দারুল কুফর বলা— এগুলো তো দারকে (ভূখণ্ড) ইসলাম এবং কুফরের দিকে নিসবত করা। আর দারকে তো ইসলাম এবং কুফরের দিকে নিসবত করা হয়, তাতে ইসলাম কিবা কুফর প্রতিষ্ঠিত থাকার বিচারে। যেমন— জান্নাতকে ‘দারুস সালাম’ নামে নামকরণ করা হয়, তাতে ‘সালাম’ (শান্তি) থাকার কারণে। তেমনি জাহান্নামকে ‘দারুল বাওয়ার’ নামে অভিহিত করা হয়, যেহেতু তাতে ‘বাওয়ার’ (ধ্বংস) রয়েছে। ইসলাম এবং কুফর প্রতিষ্ঠিত হয় তার বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দ্বারা। যখন কোনো ভূখণ্ডে কুফরি বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তা দারুল কুফর হয়ে যায়। তাই এই নিসবত সহিহ। এজন্য ইসলামের বিধান প্রতিষ্ঠা লাভের দ্বারাই কোনো ভূখণ্ড দারুল ইসলাম হিসেবে গণ্য হয়; এই একটি মাত্র শর্ত ছাড়া আর কোনো শর্ত নেই। এমনিভাবে কুফরি বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দ্বারাই দারুল ইসলাম দারুল কুফরে পরিণত হয়।” [বাদায়িউস সানায়ি’— ৯/৪৩৭৫; আলজারিমাহ ওয়াল উকুবাহ, আবু যুহরা— ৩৪১; ফাতাওয়াল ইমাম রাশিদ রেযা— ১/৩৭৩]

তাতাররা যখন ইসলামি ভূখণ্ডের কিছু দেশ দখল করে নেয়, তখন একদল ফকিহ এর আলোকেই ফতোয়া দিয়েছেন। আল্লামা ইবনু নুজাইম রহ. এর বক্তব্য দেখুন­—

“তাতারদের ব্যাপক ফেতনার পরে এই যে জায়গাগুলো, যা দখলে নিয়ে তারা সেখানে তাদের বিধিবিধান প্রয়োগ করেছে, যেমন— খুওয়ারিজম, মা ওয়ারাউন নাহর, খোরাসান প্রভৃতি, ‘যাহিরুর রিওয়ায়াত’ অনুযায়ী দারুল হারবে পরিণত হয়েছে।” [আলবাহরুর রায়িক— ৩/২৩০-২৩১; হাশিয়াতু তাবয়িনিল হাকায়িক, শিলবি— ৩/২৮৫]

 

দ্বিতীয় মাযহাব

 

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. যাহিরুর রিওয়াহর অন্যতম কিতাব ‘আযযিয়াদাতে’ ইমামে আজম আবু হানিফা রহ. এর অভিমত বর্ণনা করেন—

তিনটি শর্ত সম্মিলিতভাবে পাওয়া গেলেই দারুল ইসলাম দারুল হারবে রূপান্তরিত হবে। শর্ত তিনটি হলো—

১. এসব দেশে প্রচার-প্রসিদ্ধির সাথে কুফরি বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তা এভাবে হবে যে, শাসক কাফিরদের সংবিধান-নীতির আলোকে দেশ শাসন করবে, (ইসলামের নির্দেশনা জেনে বাস্তবায়ন করার জন্য) মুসলমান বিচারকদের কাছে ধর্না দিবে না। মুসলমানদের মাঝে ইসলামের বিধানানুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করবে না। তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া আইনকানুন হবে অনৈসলামিক আইনকানুন। মুসলমানদের ওপর আরোপিত বিধিবিধান হবে ইসলামের নির্দেশিত বিধিবিধানের সাথে বিরোধপূর্ণ ও সাংঘর্ষিক। যেমন— ইসলাম সুদকে করেছে হারাম। চাপিয়ে দেয়া আইন তা বৈধ করে দিবে। পবিত্র কোরআন ব্যভিচারকে করেছে হারাম, আর আরোপিত বিধান তার বৈধতা দিয়ে দিবে। তেমনি মদ, শূকর, জুয়া— ইসলাম করেছে হারাম, আর কার্যকর আইনের আলোকে এগুলো সবই পেয়ে যাবে বৈধতার মর্যাদা।

এর আলোকে অনুমিত হয়, দেশে যদি একই সাথে ইসলামি বিধান এবং কুফরি বিধান জারি করা হয়, তবে দারুল ইসলাম দারুল হারব হিসেবে গণ্য হবে না; যেমনটা আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি রহ.ও বলেছেন।

২. দেশটি দারুল হারব সংলগ্ন, তার সাথে লাগোয়া এবং দারুল হারবের প্রতিবেশি রাষ্ট্র হতে হবে। তার মাঝে এবং দারুল হারবের মাঝে কোনো ইসলামি ভূখণ্ড অন্তরায় হতে পারবে না, যার থেকে মুসলমানদের সাহায্য আসতে পারে। কোনো দেশকে যদি চারিদিক থেকে ইসলামি রাষ্ট্র ঘিরে রাখে, আর তার ওপর কারো ক্ষমতা নাও থাকে, তখনও তা অনৈসলামিক ভূখণ্ড হিসেবে গণ্য হবে না।

আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি রহ. বলেন, “এর আলোকে তো প্রতিভাত হয় যে, সমুদ্র কোনো অন্তরায় নয়। এরপর তিনি দু’দল ফকিহের অভিমত নকল করেন। প্রথম দল বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের হুকুম দারুল হারবের হুকুমে। অপর দল বলছেন, সমুদ্র কোনো গোষ্ঠীরই নয়; যেহেতু তার ওপর কারো ক্ষমতাই কার্যকর নয়।”

শামি রহ. আরো বলেন, “এর মাধ্যমে প্রতিভাত হয় যে, ‘বিলাদুশ শামের’ অধীনে যে ‘জাবালু তাইমিল্লাহ’, যার অপর নাম ‘জাবালে দারুয’ এবং তার অনুগামী আরো কিছু শহর— এগুলো সব দারুল ইসলাম। কেননা যদিও এসব শহরের শাসক দারুয বা নাসারা এবং তাদের ধর্মীয় বিচারকও রয়েছে, যারা তাদের ধর্মের বিধান অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করে, তাদের কেউ কেউ তো প্রকাশ্যে ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে গালমন্দ-কটুক্তি করে; কিন্তু তারা সকলেই আমাদের মুসলিম শাসকদের ফায়সালার অধীনস্থ। দারুল ইসলাম চতুর্দিক থেকে তাদের এলাকাগুলোকে বেষ্টন করে রেখেছে। মুসলমান শাসকগণ যখনই তাদের মাঝে আমাদের বিধান বাস্তবয়িত করতে চাইবেন, তখন তা করতে পারবেন।”

৩. সেখানে কোনো মুসলিম কিবা কোনো যিম্মি মুসলিম শাসক প্রদত্ত পূর্বের আমান (নিরাপত্তা) –এর মাধ্যমে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত থাকবে না। অর্থাৎ কাফিরদের আক্রমণের পূর্বে মুসলমান তার ইসলামের কারণে এবং যিম্মি তার যিম্মা চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম সরকারের পক্ষ থেকে যে আমান (নিরাপত্তা) লাভ করেছিলো, তা হারিয়ে যাওয়া। এখন তারা যদি নিরাপত্তাপ্রাপ্তও থাকে, তবে তা মুশরিকদের তরফ থেকে প্রদত্ত নিরাপত্তা; মুসলমানদের পক্ষ থেকে নয়।

আরো স্পষ্ট করে বলা হলে, মুসলমান কিবা যিম্মিরা এখন এই ভূখণ্ডে অবস্থান করা এবং নিরাপত্তা লাভ করাটা তারা ইসলামের অনুসারী এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নয়; বরং তাদের অবস্থানের বৈধতা ও নিরাপত্তা এই অঞ্চলের নতুন হারবি শাসকের সাথে কৃত ‘আহদে’র মাধ্যমে। ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়ে তারা এখন অনৈসলামিক শক্তির অধীনে। [প্রাগুক্ত এবং ফিকহুল মুলুক— ১/৪৬৩]

 

ইমাম আবু হানিফা রহ. এর দলিল

 

১. হুকুম যখন কোনো ইল্লতের (Cause) মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়, তো যতোক্ষণ ইল্লতের কিছু অংশও বাকি থাকে, তার কারণে হুকুমও বাকি থাকে। তাই যেহেতু কোনো ভূখণ্ড ইসলামের বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দ্বারা দারুল ইসলাম হিসেবে গণ্য হয়, তো যতোক্ষণ পর্যন্ত ইসলামের কিছু বিধান এবং কিছু নির্দেশনা জারি থাকবে, সেই পর্যন্ত তা দারুল ইসলাম হিসেবেই গণ্য হবে। [জামিউল ফুসুলাইন— ১/১৩]

২. আল্লামা কাসানি রহ. বলেন, “ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বক্তব্যের কারণ হলো, দার (ভূখণ্ড) কে ইসলাম এবং কুফরের দিকে নিসবত করার দ্বারা আসলে তো ইসলাম কিবা কুফর –এর হাকিকত উদ্দেশ্য নয়। (ভূখণ্ড তো আর মুসলমান বা কাফির হয় না)। উদ্দেশ্য হলো আমান (নিরাপত্তা) এবং খাওফ (ভীতি)।

এর অর্থ হলো, যদি সাধারণভাবে মুসলমানদের জন্য আমান (নিরাপত্তা) থাকে, আর কাফিরদের জন্য স্বাভাবিকভাবে খাওফ (ভীতি) থাকে (পূর্ণ নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আলাদা চুক্তি করতে হয়), তাহলে তা দারুল ইসলাম। আর যদি সাধারণভাবে মুসলমানদের জন্য খাওফ (ভীতি) থাকে আর কাফিরদের জন্য স্বাভাবিকভাবে থাকে আমান (নিরাপত্তা), তাহলে তা দারুল কুফর। হুকুমের ভিত্তি হলো আমান এবং খাওফ (নিরাপত্তা এবং ভীতি) –এর ওপর, হাকিকি ইসলাম এবং কুফরের ওপরের নয়। তাই আমান এবং খাওফকেই বিবেচনায় নেয়াটা উত্তম। তো যতোক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানদেরকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করতে হবে না, ততোক্ষণ পর্যন্ত সাধারণভাবে আমান রয়েছে ধরা হবে। তাই তা দারুল কুফরে পরিণত হবে না।

তেমনিভাবে সাধারণ নিরাপত্তা তখনই বিনষ্ট হওয়া সম্ভব, যখন সে অঞ্চলটা দারুল হারব সংলগ্ন হবে। তাহলে দারুল ইসলাম দারুল হারবে পরিণত হওয়ার জন্য দুটো বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল— আমান (নিরাপত্তা) নষ্ট হওয়া এবং দারুল হারবের সংলগ্ন অঞ্চল হওয়া।

‘দার’কে ইসলামের দিকে নিসবত করার হেতু (Cause) সেটাও হতে পারে যা সাহিবাইন বলেছেন (সাহিবাইনের মাযহাবের প্রমাণ দ্রষ্টব্য), আর তাও হতে পারে যা ইমাম আবু হানিফা রহ. এর পক্ষে আমরা বলছি। অর্থাৎ সাধারণভাবে মুসলমানদের জন্য নিরাপত্তা সাব্যস্ত থাকা। কাফিরদের জন্য নিরাপত্তা সাব্যস্ত হওয়ার জন্য আলাদা ‘যিম্মাহ চুক্তি’ কিবা ‘ইস্তিমান চুক্তি’ প্রয়োজন। (বিস্তারিত বিবরণ সিরিজের অন্য লেখায় আসবে ইনশাআল্লাহ।)

দারকে ইসলামের দিকে নিসবত করার হেতু যদি তা হয়, যা সাহিবাইন বলেছেন, তাহলে কোনো অঞ্চল দারুল কুফর হিসেবে গণ্য হবে সেই কারণে, যা তারা বলেছেন। আর যদি এই নিসবতের হেতু তা হয়, যা আমরা বলেছি, তাহলে তখনই দারুল হারব হিসেবে গণ্য হবে, যখন আমাদের বর্ণিত শর্তগুলো পাওয়া যাবে। সুতরাং নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত দারুল ইসলাম শুধু সন্দেহ-সম্ভাবনার কারণে দারুল কুফরে পরিণত হবে না; স্বীকৃত মূলনীতির আলোকে— ‘‘যা সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত তা সন্দেহ-সম্ভাবনার কারণে বিদূরিত হয় না।’’ [এই কায়দা (মূলনীতি) সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন— আলআশবাহ ওয়ান নাযায়ির, ইবনে নুজাইম— ৫৭; আলআশবাহ, সুয়ুতি— ৫৩; আলমানসুর ফিল কাওয়ায়িদ, যারকাশি— ২/২৫৫; শরহুল কাওয়ায়িদিল ফিকহিয়্যা, যারকা— ৩৫-৪১; দুরারুল হুককাম— ১/২০]

তবে দারুল কুফরের বিষয়টা ভিন্ন। সেখানে ইসলামের বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দ্বারাই তা দারুল ইসলাম হয়ে যাবে। কেননা সেখানে ইসলামের দিকের প্রাধান্য। (যদিও বাহ্যত মনে হয়, সেখানে সম্ভাবনাপূর্ণ বিষয়ের মাধ্যমে সুনিশ্চিত বিষয়কে রহিত করা হয়েছে, কিন্তু) হাদিসের কারণে সেখানে সন্দেহ-সম্ভাবনা দূর হয়ে যাবে। (আর সুনিশ্চিত বিষয়ের মাধ্যমে আরেকটা সুনিশ্চিত বিষয় দূর হতে পারে।) হাদিসটি হলো—

الإسلام يعلو ولا يعلى عليه

ইসলাম উন্নীত থাকে। তার ওপর অন্য কিছু উন্নীত হয় না। (হাদিসটি ইবনে আব্বাস রা. থেকে মাওকুফ এবং সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন— সহিহ বুখারি, জানাযা অধ্যায়, তা’লিক— ৩/২১৮। ইমাম তহাবি রহ. হাদিসটিকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন। দেখুন— ৩/২৫৮। আব ইয়া’লা খলিলি আলফাওয়ায়িদে এবং রুওয়ানি আলমুসনাদে হাসান সূত্রে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আরো দেখুন— সুনানে দারাকুতনি— ৩/২৫২; সুনানে বায়হাকি— ৬/২০৫; দালায়িলুন নুবুওয়াহ— ৬/৩৬; দালায়িল, আবু নুয়াইম— ৩২১। দেখুন— নাসবুর রায়াহ— ৩/২১৩; ফাতহুল বারি— ৩/২২০; আততালখিসুল হাবির— ৪/১২৬; তাগলিকুত তা’লিক— ২/৪৯০; ফায়জুল কাদির— ৩/১৭৯; ইরওয়াউল গালিল— ৫/১০৬-১০৯)

এরপর আল্লামা কাসানি রহ. বলেন, “নিসবত যদি ইসলামের বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিবেচনায়ও হয় (যেমনটা সাহিবাইনের অভিমত), তবুও কুফরি বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য উপরিউক্ত দুটো শর্ত প্রয়োজন— অর্থাৎ, দারুল হারবের সংলগ্ন হওয়া এবং পূর্বের আমান (নিরাপত্তা) নষ্ট হয়ে যাওয়া। কেননা কুফরি বিধান প্রতিষ্ঠিত হবে কেবল প্রতিরক্ষাবাহিনীর মাধ্যমে। আর প্রতিরক্ষাশক্তি সেই দু’শর্তের মাধ্যমেই অস্তিত্ব লাভ করে। [বাদায়িউস সানায়ি— ৯/৪৩৭৫-৪৩৭৬]

 

দুই মাযহাবের মধ্যে পার্থক্য কী?

 

 

উপরিউক্ত আলোচনা স্পষ্টভাবে বুঝলে এ বিষয়টাকে আলাদা করে আর বলার প্রয়োজন পড়ে না। তারপরও বিষয়টাকে আরো স্পষ্ট করার জন্য আমরা এ শিরোনামে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে পারি।

ইমাম আবু হানিফা রহ. এবং অন্য সকল ইমামই কোনো ভূখণ্ডের ওপর বিধানারোপ করার ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে শক্তি এবং প্রাধান্যতাকে বিবেচনায় নিয়েছেন। তবে তাদের মাঝে যে বিষয়ে এসে ইখতিলাফ হয়ে গেছে, আল্লামা সারাখসি রহ. এর ভাষায় তা হলো—

“কিন্তু ইমাম আবু হানিফা রহ. বিবেচনায় নিয়েছেন বল এবং শক্তির পূর্ণতা। কেননা এই শহর ইতিপূর্বে দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত ছিলো, মুসলমানদের রক্ষণকারী হিসেবে। এখন সেই ইহরায (রক্ষণশক্তি) মুশরিকদের পূর্ণ প্রতাপ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমেই বিতাড়িত হওয়া সম্ভব। আর তা এই তিন শর্ত সম্মিলিতভাবে পাওয়া গেলেই সম্ভব। কেননা যখন তা দারুশ শিরক সংলগ্ন না হবে, তখন চারিদিক থেকে মুসলমানদের বেষ্টনীর মাঝে থেকে তার অধিবাসীরা পরাভূত থাকবে। তেমনি সেখানে মুসলমান এবং যিম্মি যদি (পূর্বের নিরাপত্তার অধীনেই) নিরাপদ থাকে, তবে তা মুশরিকদের পূর্ণ প্রতাপ না থাকার প্রমাণ। এর দৃষ্টান্ত হলো সেই মাসআলা, হারবিরা যদি দারুল ইসলামে অবস্থানরত কোনো মুসলমানের সম্পদ আত্মসাৎ করে, তবে তাদের নিজেদের দেশে সংরক্ষণ করার পূর্ব পর্যন্ত তারা সেই সম্পদের মালিক হয় না; যেহেতু পূর্ণ প্রতাপ নেই।

এরপর যতোক্ষণ মূলের নিদর্শনসমূহের কোনো একটাও বাকি থাকে, তখন হুকুম তার ওপরই হয়, আপতিত বিষয়ের ওপর নয়। যেমন কোনো মহল্লা, যতোক্ষণ তার মাঝে একজন বাড়িওয়ালাও থাকবে, ততোক্ষণ হুকুম তার ওপরেই হবে, সে পর্যন্ত সেখানে নতুন আবাসগ্রহণকারী এবং ক্রেতাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। এই ভূখণ্ড তো মূলত দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত ছিলো, তো যতোক্ষণ তার মাঝে কোনো মুসলিম কিবা যিম্মি (পূর্বের নিরাপত্তার অধীনে নিরাপদ) থাকবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত মূলের নিদর্শনসমূহের মধ্য থেকে একটি নিদর্শন তো বাকি থাকবে। সুতরাং সেই হুকুম (অর্থাৎ, দারুল ইসলাম থাকা এবং দারুল হারবে পরিণত না হওয়া) বাকি থাকবে। এটা ইমাম আবু হানিফা রহ. এর একটি উসুল।

তেমনই প্রত্যেক জায়গার হুকুমের ক্ষেত্রে তার আশপাশের জায়গার অবস্থা বিবেচ্য। সুতরাং যখন এই ভূখণ্ডের চারিদিকে দারুল ইসলাম, তখন এই ভূখণ্ডের ওপর দারুল হারবের বিধান আরোপিত হবে না। যেমনিভাবে সেখানে শিরকি বিধান প্রতিষ্ঠিত না হলে তা আরোপ করা হতো না। মুরতাদরা এর ওপর দিনের কিছু সময়ের জন্য দখল নিয়েছে মাত্র।” (ফুঁ দিলেই আবার উড়ে যাবে।) [আলমাবসুত— ১০/১১৪]

তাতাররা যখন ইসলামি ভূখণ্ডের ওপর তাদের দখল প্রতিষ্ঠা করে, তখন ফকিহগণের ফতোয়া দু’রকমই ছিলো। ওপরে আমরা আল্লামা ইবনে নুজায়ম রহ. এর ফতোয়া উদ্ধৃত করেছি। তিনি সাহিবাইনের অভিমতের আলোকে তখন তাতারদের পদানত রাষ্ট্রগুলোকে দারুল হারব বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন। এবার আমরা ইমাম আবু হানিফা রহ. এর অভিমতের আলোকে প্রদত্ত ফতোয়ার নমুনা দেখবো।

ইমাম ইবনুল বাযযায কারদারি ইমাম আবু শুজা’ রহ. এর ফতোয়া উল্লেখ করেন, “আজ (হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে) যে-সব ভূখণ্ড কাফিরদের হাতে, সন্দেহ নেই যে, এ জায়গাগুলো দারুল ইসলাম। যেহেতু তা দারুল হারবের সাথে সংযুক্ত নয় এবং তাতে কুফরি বিধানও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং বিচারকরা মুসলমান। এবং শাসকরা— জরুরতের কারণে যাদের তারা আনুগত্য করে, তারা মুসলমান আর জরুরত ছাড়া যাদের আনুগত্য করে, তাদের আনুগত্য ‘মুওয়াদাআ’। যেসব অঞ্চলের ওপর তাদের পক্ষ থেকে নিয়োগকৃত মুসলমান গভর্নর রয়েছে, সেখানে জুমআ ঈদ কায়িম করা, খারাজ উশুল করা এবং বিচারকদের তাকলিদ করা বৈধ। …তার কাফিরদের আনুগত্য করাটা ‘মুওয়াদাআ’ বা ‘মুখাদাআ’। …আর এ উসুল তো স্থির হয়েছে যে, ইল্লতের কিছু অংশ বাকি থাকার দ্বারাও হুকুম বাকি থেকে যায়। আর আমরা সবাই তো –কোনো ইখতিলাফ ছাড়াই- হুকুম আরোপ করেছি যে, তাতারদের দখলদারিত্বের পূর্বে এই অঞ্চলগুলো দারুল ইসলামের অন্তর্গত ছিলো। আর তাদের দখলদারিত্বের পরে, আজান দেয়া, জুমআ জামাআত আদায় তাদের শাসকদের তরফ থেকে কোনো প্রকার আপত্তি ছাড়াই চলছে। তাই এসব অঞ্চলের ওপর দারুল হারবের বিধান আরোপ করার কোনো কারণ নেই।” [ফাতাওয়া বাযযাযিয়া— ৩/৩১১-৩১২]

এরপর তিনি হানাফিদের শায়খ শামসুল আয়িম্মাহ আব্দুল আযিয আলহালওয়ানি রহ. এর ফতোয়া উল্লেখ করেন, “কোনো ভূখণ্ড দারুল হারব হয়— যখন সেখানে কুফরের বিধান জারি করা হয়। সেখানে কোনো ফায়সালা ইসলামের বিধানের আলোকে করা হয় না। এবং তা দারুল হারব সংলগ্ন হয়। আর সেখানে কোনো মুসলিম কিবা কোনো যিম্মি পূর্বের নিরাপত্তার অধীনে নিরাপদ থাকে না। যখন এই সবগুলো শর্ত পাওয়া যায়, তখন কোনো দেশ দারুল হারব হয়। যখন দলিল এবং শর্তের মাঝে বিরোধ দেখা দেয়, তখন দেশ যা ছিলো তা-ই থাকবে। অথবা সতর্কতার দাবি হিসেবে ইসলামের দিকটাই প্রাধান্য পাবে। তুমি দেখছো না যে, শুধু ইসলামের বিধান জারি করার দ্বারা সর্বসম্মতিক্রমে দারুল হারব দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়।” [প্রাগুক্ত; আল্লামা তুমুরতাশি রহ. ও এমন ফতোয়া উল্লেখ করেছেন দুই মহান ইমামের থেকে— ইমাম ইসবিজানি এবং ইমাম ইমাদি রহ.। দেখুন— আদদুররুল মুনতাকা— ১/৬৩৪; জামিউর রুমুযের উদ্ধৃতিতে কাশশাফুল ইসতিলাহাত— ২/২৫৬]

 

কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ফতোয়া

 

দারুল ইসলাম কীভাবে দারুল হারবে রূপান্তরিত হয় —এ বিষয়ে আমরা পূর্বের লেখায় সবিস্তারে আলোচনা করেছি। সেখানে আমরা প্রসিদ্ধ চার ইমামের ফতোয়া উল্লেখ করেছি; যার সারকথা— ইমাম মালিক ইমাম শাফেয়ি এবং ইমাম আহমদ আর আমাদের মাযহাবের সাহিবাইন— অর্থাৎ, ইমাম আবু ইউসুফ এবং ইমাম মুহাম্মাদ রহ. —এর মতে কোনো ইসলামি ভূখণ্ডে কুফরি বিধান প্রতিষ্ঠার দ্বারাই তা দারুল হারব হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা রহ. —এর মতে তিনটি শর্ত সম্মিলিতভাবে পাওয়া গেলেই কেবল কোনো ভূখণ্ড দারুল হারব হয়; অন্যথায় নয়। শর্ত তিনটির বর্ণনাও আমরা উল্লেখ করে এসেছি।

আজ আমরা এই মাসআলার পরিশিষ্টে অন্যান্য ফকিহগণের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ফতোয়া উল্লেখ করবো।

কোনো কোনো মালেকি ফকিহের অভিমত হলো, যতোক্ষণ পর্যন্ত দেশে ইসলামের শা’আইর কায়িম করা যাবে, (যেমন আযান দেয়া, ঈদ জুমআ ও নামাজের জামাত আদায় করতে পারা ইত্যাদি। শা’আইরের ব্যাখ্যা এই লেখার শেষাংশে দ্রষ্টব্য।) তখন পর্যন্ত দেশ দারুল হারব হবে না।

শায়খ মুহাম্মাদ বিন আ’রাফা দাসুকি রহ. (মৃত্যু— ১২৩০ হি.) বলেন, “কাফিরদের দখলদারিত্বের মাধ্যমেই কেবল ইসলামি রাষ্ট্র দারুল হারব হবে না। বরং যতোক্ষণ পর্যন্ত শা’আইরে ইসলাম পালনের সুযোগ থাকবে, তখন পর্যন্ত রাষ্ট্র দারুল ইসলামই থাকবে। যে পর্যন্ত রাষ্ট্রে ইসলামের সবগুলোর শা’আইর কিবা তার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত থাকবে, সে পর্যন্ত রাষ্ট্র দারুল হারব হবে না।” [হাশিয়াতুদ দাসুকি আলাশ শারহিল কাবির— ২/১৮৮]

কোনো কোনো শাফেয়ি ফকিহের অভিমত— যে দেশে মুসলমানরা বসবাস করতো, এরপর কাফিররা তা দখল করে নিয়ে সেখানে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছে, কুফরি বিধান-সংবিধান জারি করেছে, তা দারুল ইসলামই থাকবে; দারুল হারবে পরিণত হবে না।

শায়খ যাকারিয়া আনসারি রহ. (মৃত্যু— ৯২৬) বলেন, “যে দেশে একজন মুসলমানও বসবাস করে, তা দারুল ইসলাম। সুতরাং সেখান থেকে হিজরত করা হারাম। যাতে করে তা দারুল হারবে পরিণত না হয়ে যায়।” [শারহু মানহাজিত তুল্লাব— ৪/২৪৪; আসনাল মাতালিব— ৪/২০৪]

আল্লামা শামসুদ্দীন রামালি রহ. (মৃত্যু— ১০০৪ হি.) দারুল হারবে ইসলাম গ্রহণ করেছে— এমন ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন, “সে যদি সেখানে হারবিদের থেকে নিরাপদে থেকে আলাদাভাবে বসবাস করতে পারে আর (ইসলামি ভূখণ্ডে) হিজরত করার দ্বারা মুসলমানদের পক্ষ থেকে সাহায্য প্রাপ্তির আশাও না থাকে, তাহলে সেখানে তার অবস্থান করা ওয়াজিব। কেননা তার অবস্থানস্থল এখন দারুল ইসলামই রয়েছে। সে হিজরত করলে দারুল হারব হয়ে যাবে। …এর থেকে এ মাসআলাও গৃহীত হয় যে, প্রত্যেক এমন জায়গা, যেখানকার অধিবাসীরা হারবিদের থেকে নিরাপদে থাকতে পারে, তা দারুল ইসলাম থাকবে। সুতরাং কাফিরদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও তা দারুল কুফর হিসবে গণ্য হওয়াটা অসম্ভব। যেমনটা স্পষ্টভাবে হাদিসের বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, “ইসলাম উন্নীত থাকবে। তার ওপর অন্য কিছু উন্নীত হবে না। (হাদিসের তাখরিজ পূর্বের পোস্টে দ্রষ্টব্য)। তাই ফকিহগণ যে বলেন, ‘অমুক দেশ তো দারুল হারব হয়ে গেছে’ —এর দ্বারা বাহ্যত (সুরাতান) তা দারুল হারব হওয়াটা উদ্দেশ্যে; হুকুমের বিচারে নয়। অন্যথায় তো অপরিহার্য হয় যে, তারা দারুল ইসলামের যে অংশ দখল করবে, তা-ই দারুল হারব হয়ে যাবে। এটা তো দুরূহ।” [নিহায়াতুল মুহতাজ— ৮/৮২, ৫/৪৫৪; মুগনিল মুহতাজ— ৪/২৩৯; হাশিয়াতুল কালয়ুবি এবং হাশিয়াতু উমায়রা— ৪/২২৭]

স্পেনে খ্রিস্টানদের দখল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর আরগুনের মুসলমানদেরকে তিনি এই ফতোয়াই দিয়েছিলেন— “বরং এখান থেকে হিজরত করা জায়িয নেই। কেননা মুসলমানদের অবস্থানের দ্বারা অন্যান্যদের ইসলাম গ্রহণের প্রত্যাশা থাকে। আরেকটি কারণ হলো, এ ভূখণ্ড তো দারুল ইসলাম। এখন তারা যদি হিজরত করে, তবে তা দারুল হারব হয়ে যাবে। [ফাতাওয়া রামালি, ইবনে হাজার হাইতামির ‘আলফাতাওয়াল কুবরা’র হাশিয়ায় প্রকাশিত—৪/৫৩-৫৪; নিহায়াতুল মুহতাজ— ৫/৪৫৪]

তাদেরও আগে ইমাম রাফেয়ি রহ. (মৃত্যু— ৬২৩ হি.) —এর বক্তব্যেও এদিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “দারুল ইসলাম তিন প্রকার।

১. এমন দেশ, যেখানে মুসলমানরা বাস করে।

২. এমন দেশ, যা মুসলমানরা বিজয় করেছে।

৩. এমন দেশ, যেখানে মুসলমানরা বসবাস করতো। এরপর তারা নির্বাসিত হয়েছে আর কাফিরদের আধিপত্য সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”

কাফিরদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তিনি সেই দেশকে দারুল ইসলামই গণ্য করছেন। এরপর তিনি এই ব্যাপক কথাটিকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগ করছেন।

“ফকিহগণ (আসহাবুশ শাফেয়ি রহ.) যে তৃতীয় প্রকারকেও দারুল ইসলাম গণ্য করেছেন, তার কারণ হলো, তাদের বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মুসলমানদের পূর্বের কর্তৃত্ব (দারুল ইসলাম থাকার) হুকুম বাকি থাকার জন্য যথেষ্ট। মুতাআখখির (পরবর্তী) কোনো ফকিহকে দেখেছি, তারা এই বক্তব্যকে সেক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন, যখন হারবিরা মুসলমানদের জন্য বাধা-প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। যদি তা করে, তবে সেই দেশ দারুল কুফর।” [আলআযিয শরহুল ওয়াজিয— ৬/৪২৩-৪২৪; রাওযাতুত তালিবিন, নববি— ৫/৪৩৩-৪৩৪]

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (মৃত্যু— ৭২৮ হি.) কে ‘মারিদিন’ শহর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো— তা কি দারুল ইসলাম নাকি দারুল হারব? তিনি উত্তর দিলেন, “তা দারুল হারব নাকি দারুল ইসলাম —এ ব্যাপারে কথা হচ্ছে, তা হলো যৌগিক দেশ, যার মাঝে দু’দিকই পাওয়া যায়। তা দারুল ইসলামের পর্যায়ে নয়, যেখানকার সেনাবাহিনী মুসলমান হওয়ার কারণে তাতে ইসলামি বিধান কার্যকর রয়েছে। আবার দারুল হারবের পর্যায়েও নয়, যার অধিবাসীরা কাফির-বেইমান। বরং তা তৃতীয় একটি প্রকার। সেখানকার মুসলমানদের সাথে তাদের প্রাপ্য অনুযায়ী আচরণ করা হবে। আর ইসলামি শরিয়ত থেকে যারা খারিজ, তাদের সাথে তাদের প্রাপ্য অনুযায়ী কিতাল করা হবে।” [ফাতাওয়া শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া— ২৮/২৪০-২৪১]

 

পাঠকের এ কথা বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয় যে, উপরিউক্ত সবগুলো ফতোয়াই হলো বিচ্ছিন্ন মতামত, যা মাযহাবের ইমামগণের বক্তব্য-অভিমতের সাথে বিরোধপূর্ণ। এজন্য উম্মাহর ফকিহগণ এসব বিচ্ছিন্ন মতামত গ্রহণ করেননি। যারা বড়, তাদেরও দু-চারটি বিচ্ছিন্ন মতামত থাকতেই পারে। এক্ষেত্রে তারা অনুসরণীয় নন। মাওলানা আবদুল মালেক দা. বা. প্রায়ই বলেন, “যাল্লাত (ভুল-বিচ্যুতি) —এর ক্ষেত্রে কারোরই অনুসরণ জায়িয নেই।” এজন্য ইবনু তাইমিয়া রহ. —এর শাগরিদ ইবনু মুফলিহ রহ. পর্যন্ত মহান ইমামগণের সর্বসম্মত মতকে বাদ দিয়ে উস্তাদের এই বিচ্ছিন্ন অভিমত গ্রহণ করেননি। (দেখুন— আলআদাবুশ শারইয়্যাহ— ১/২১২)। তবে এই দু-চারটি বিচ্ছিন্ন মত এবং ভুলের কারণে কোনো ইমাম বা ফকিহের বিরুদ্ধে ‘যবানদারাযি’ করারও কোনো সুযোগ নেই। ইমাম মালিক রহ. সুন্দর বলেছেন—

كل يؤخذ من قوله و يترك، إلا صاحب هذا القبر؛ يعني: النبي صلى الله عليه و سلم.

“সবাই এমন, যার কিছু কথা গ্রহণ করা হয় আর কিছু কথা পরিত্যাগ করা হয়, শুধু এই কবরের মানুষটি— অর্থাৎ, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ছাড়া।” (ইমাম বুখারি ‘কিরাত খালফাল ইমাম’ অধ্যায়ে ইবনে আব্বাস রা. এবং মুজাহিদ রহ. থেকেও অনুরূপ বক্তব্য উল্লেখ করেছেন।) উদ্দেশ্য হলো, একমাত্র নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই এমন, যার সব কথা ও কাজ গ্রহণীয়। এ ছাড়া অন্য যতো মানুষ আছে, সাহাবি তাবেয়ি কিবা উম্মাহর বিদগ্ধ যতো আলিম এবং ফকিহ, সবার ব্যাপারে একই কথা— চোখ বুজে তাদের সব কথা-কাজের অনুসরণ করার সুযোগ নেই। কেননা একমাত্র নবি ছাড়া কেউই ভুলের উর্ধ্বে নয়। এ যুগে তো কিছু মানুষ এমনও পাওয়া যায়, যারা খুঁজে খুঁজে সালাফের বিচ্ছিন্ন মতগুলো বের করে সেগুলোর অনুসরণ করে, সামাজিক মাধ্যমেও তা প্রচার করে। শায়খুল ইসলাম দা. বা. —এর ভাষায়, তারা মূলত শরিয়ত নিয়ে খেলা করছে। শরিয়তকে তাদের মানস-প্রবৃত্তির অনুগামী বানিয়ে নিয়েছে। আদতে তারা শরিয়তের অনুসরণ করে না। করে নফসের পূজা।

 

টীকাঃ ‘শাআইর’ কাকে বলে

মাওলানা আবদুল মালেক দা. বা. এ বিষয়ে যা বলেছেন—

‘শাআইর’ আরবী শব্দ। ‘শায়ীরাতুন’ এর বহুবচন। ‘শায়ীরাতুন’ অর্থ হচ্ছে, নিদর্শন, প্রতীক। তাহলে ‘শাআইরুল্লাহ’ অর্থ হচ্ছে আল্লাহর নিদর্শন। কুরআন-হাদীসে শাআইরের ব্যাখ্যা এসেছে; যার সারসংক্ষেপ এই যে, আল্লাহ তাআলা বিশেষ কিছু স্থান, কিছু কাজ এবং কিছু বস্তুকে সম্মানিত করেছেন এবং সেগুলোকে তাঁর কুদরত ও আযমতের চিহ্ন সাব্যস্ত করেছেন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের নিদর্শন ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলার আদেশের কারণে এগুলো বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। শীর্ষস্থানীয় শাআইরের মধ্যে রয়েছে, কালামুল্লাহ অর্থাৎ কুরআন মজীদ এবং কালিমাতুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর কালিমা। কালেমা তাইয়্যেবা, কালেমা শাহাদত ইত্যাদি। বিশেষ স্থানসমূহের মধ্যে রয়েছে বাইতুল্লাহ, মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী এবং ইহুদীদের কব্জায় থাকা মুসলমানদের প্রথম কেবলা মসজিদে আকসা। এরপর সকল মসজিদ। তদ্রূপ আরাফা, মিনা-মুযদালিফা ‘শাআইরুল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত। কুরবানীর পশুও শাআইরুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত। [দেখুন— http://www.alkawsar.com/article/65]

 

দারুল ইসলাম দারুল হারব বিভক্তি কি ফকিহদের আবিষ্কার, নাকি কোরআন সুন্নাহর শিক্ষা?

 

এখন তো সব কিছুতে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তার লাভ করেছে। মুক্তমনা আধুনিকমনস্ক কিছু কিছু লেখক দারুল ইসলাম এবং দারুল হারবের বিভক্তির অসারতা প্রমাণ করে দীর্ঘ দীর্ঘ প্রবন্ধ বই রচনা করছে। তাদের দাবি, ইসলাম তো অসাম্প্রদায়িক ধর্ম, শান্তির ধর্ম। ইসলামের মূল চেতনার সাথে নাকি এই বিভক্তি খাপ খায় না। তাই তারা ইসলামের ‘ইমেজ’ রক্ষার্থে কেউ কেউ তো এই বিভক্তিকেই গোড়া থেকে অস্বীকার করেছেন, আর কেউ কেউ নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে পুরো দুনিয়াকেই দারুল ইসলাম হিসেবে গণ্য করেন। তাদের ব্যাখ্যার আলোকে কোনো দেশ বা ভূখণ্ড দারুল হারব হয় না। সর্বোচ্চ কোনো কোনোটাকে তারা দারুল আমান অভিধায় অভিহিত করেন।

প্রথমে আমরা তাদের দাবিগুলোর দিকে একটু দৃষ্টিপাত করি। এরপর শরিয়তের দৃষ্টিতে সেগুলোর পর্যালোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

১. এই বিভক্তির ভিত্তি বাস্তবতার ওপর, শরিয়তের নির্দেশনার ওপর নয়। হিজরি দ্বিতীয় শতকে ফকিহদের মাধ্যমে এই বিভক্তি ও বন্টন অস্তিত্ব লাভ করে। এই বন্টনের মানাত হলো আম্‌ন এবং খাওফ (নিরাপত্তা এবং ভীতি)। এক্ষেত্রে তারা ইমাম আবু হানিফার বক্তব্যকেও প্রয়োগ করতে চান। তো ভিনদেশ বা দারুল হারব তাই হবে, যার সাথে কোনো কারণে ইসলামি রাষ্ট্রের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

২. এটা একটা আপতিত অবস্থার বন্টন। সর্বদা প্রয়োগ করা হবে এমন নয়। যখন মুসলমান এবং কাফিরদের মাঝে যুদ্ধ চলমান থাকবে কিবা এই বন্টনকে অপরিহার্য করে এমন কোনো কারণ পাওয়া যাবে, তখনই কেবল এই বিভক্তিকে মেনে নেয়া হবে। কোনো দেশকে দারুল হারব ফতোয়া দিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের থেকে তাদেরকে দূরে ঠেলে দেয়াটা ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলাম তো তাদের হেদায়াত চায়। আর এর মাধ্যম হলো শান্তিপূর্ণ দাওয়াত। তো দাওয়াতের স্বার্থেই এই বন্টনকে সার্বক্ষণিকভাবে মেনে নেয়া যায় না। ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে যার শান্তিচুক্তি ও শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করে, তা কখনো দারুল হারব হয় না। দারুল হারব তখন হয়, যখন কোনো দেশের সাথে যুদ্ধ চলে।

৩. মৌলিকভাবে পুরো দুনিয়া একটি ভূখণ্ড, এক দার; যেমনটা ইমাম শাফেয়ি রহ. ও বলেছেন।

৪. কোনো ভূখণ্ড দারুল ইসলাম কিবা দারুল হারব হওয়ার কারণে বিভিন্ন বিধানে যে ভিন্নতা হয়, তাও শুধু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতে প্রযোজ্য। এটা শান্তি বিনষ্টকারী যুদ্ধের বদ প্রভাবগুলোর একটি।

৫. হারবি শব্দটি শত্রু অর্থে নয়। দু’দেশের মাঝে শত্রুতা বিরাজ করবে শুধু যুদ্ধাবস্থায়। যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেলে পুনরায় পুরো দুনিয়া একই দার হিসেবে গণ্য হবে। নেই কোনো বিভেদ কিবা বিভক্তি। সকলে ভাই ভাই।

 

এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রাথমিক অবস্থায় ছিলো শুধু অমুসলিম প্রাচ্যবিদ গবেষকদের। এরপর একশ্রেণির বিদগ্ধ মুসলিম ফকিহও তাদের সঙ্গ দিয়েছে। মুজতাহিদ ইমামগণের বক্তব্যে চিরুনি অভিযান চালিয়ে, তাদের বক্তব্য থেকে ইল্লত (Cause) বের করে অমুসলিমদের এই দাবিকে শক্তিশালী করার প্রয়াস পেয়েছে। প্রতিথযশা দু-চারজন ফকিহও চেতনে বা অবচেতনে এই জালে ফেঁসেছেন। তাদের গ্রন্থাবলি দ্বারা প্রভাবিত শ্রেণির মাঝেও ধীরে ধীরে এই ভাইরাস প্রসার লাভ করেছে। যেমন শায়খ আবু যুহরার আলোচনা থেকে উপরিউক্ত চতুর্থ বিষয়টি প্রতিভাত হয়। ১-৩ বিষয়গুলো ড. ওয়াহবা যুহায়লির আলোচনা থেকে অনুমিত হয়। অন্য কোনো লেখায় সবিস্তারে তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হবে ইনশাআল্লাহ।

.

আমরা এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করবো— দারুল ইসলাম দারুল হারবের বিভক্ত কি আদতে ফকিহগণের আবিষ্কার, নাকি শরিয়তের নির্দেশনা।

.

দারুল ইসলাম এবং দারুল হারবের বন্টন ফকিহদের আবিষ্কৃত কোনো বিষয় নয়। এটা একটা মৌলিক বন্টন, যা শরিয়ত নির্দেশনা করেছে, কোরআন-সুন্নাহ শিখিয়েছে। এই পরিভাষা রাসুলের যুগে ছিলো না ঠিক, তবে এই বন্টন এবং বিভক্তি অবশ্যই ছিলো।

 

আমরা পবিত্র কোরআনে দেখতে পাই, কোরআন দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করছে, সকল মানুষ এক শ্রেণি নয়। আল্লাহ বলেন—

هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ فَمِنكُمْ كَافِرٌ وَمِنكُم مُّؤْمِنٌ {التغابن:2}

তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তোমাদের একদল কাফির, একদল মুমিন। {সুরা তাগাবুনঃ ২}

 

শরিয়ত আমাদেরকে জানায়, এই প্রত্যেক দলের আলাদা আলাদা দেশ এবং ভূখণ্ড থাকবে, যা তাদেরকে সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ করে রাখবে। পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াত থেকে আমরা ‘দার’ বিভক্তির ইঙ্গিত পাই। দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েকটি আয়াত লক্ষ করুন—

 

وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ

এবং তারা, যারা পূর্ব থেকেই ইমানের সাথে সেই ‘দারে’ অবস্থান করছে। তারা মুহাজিরদেরকে ভালোবাসে। {সুরা হাশরঃ ৯}

سَأُرِيكُمْ دَارَ الْفَاسِقِينَ

আমি শীঘ্রই সত্যত্যাগীদের ‘দার’ তোমাদেরকে দেখাবো। {সুরা আরাফঃ ১৪৫}

تَمَتَّعُوا فِي دَارِكُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ

তোমরা তোমাদের ‘দারে’ তিন দিন জীবন উপভোগ করে নাও। {সুরা হুদঃ ৬৫}

وَمَا لَكُمْ لا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيّاً وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيراً

তোমাদের কী হলো, তোমরা আল্লাহর পথে অসহায় পুরুষ নারী এবং শিশুদের পক্ষে লড়াই করছো না! যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে এই জনপদ থেকে বের করো, যার অধিবাসীরা জালিম। আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক বানিয়ে দিন। আমাদের জন্য আপনার তরফ থেকে একজন সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন। {সুরা নিসাঃ ৭৫}

যে ভূমিতে আল্লাহর শত্রুরা আল্লাহর বান্দাদেরকে দুর্বল করে রাখে, তাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করে, যার ফলে তারা আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে উপরিউক্ত দুআ করে, যেনো তাদেরকে জালিমদের নিয়ন্ত্রিত এবং যেখানে তাদের শাসন-ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত তা থেকে আল্লাহ তাদেরকে বের করে আনেন— নিশ্চয়ই তা দারুল ইসলাম নয়, দারুল হারব।

 

আরো কয়েকটি আয়াত লক্ষ করুন—

أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ * الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٍّ إِلا أَنْ يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ وَلَوْلا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيراً وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ * الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الأُمُورِ

যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদেরকে অনুমতি দেয়া হলো (তারা নিজেদের প্রতিরক্ষার্থে যুদ্ধ করতে পারবে), যেহেতু তাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদেরকে জয়যুক্ত করতে পরিপূর্ণ সক্ষম। যাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে শুধু এজন্য বের করে দেয়া হয়েছে, যেহেতু তারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ। আল্লাহ যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে ধ্বংস করে দেয়া হতো খানকাহ-গির্জা, ইবাদতখানা এবং মসজিদসমূহ, যাতে অধিক পরিমাণে আল্লাহর সিকির করা হয়। আল্লাহ অবশ্যই তাদের সাহায্য করবেন, যারা তার দীনের সাহায্য করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী। তারা এমন যে, আমি যদি দুনিয়ায় তাদেরকে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, সৎকাজের নির্দেশ জারি করবে এবং অসৎকাজের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। আল্লাহরই হাতে সবকাজের পরিণতি। {সুরা হজঃ ৩৯-৪১}

উপরিউক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা মূলনীতি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে কোনো ভূখণ্ড দারুল কুফর হয়। আর তা হলো জুলুমের প্রসার। সর্বোচ্চ জুলুম হলে স্রষ্টার সাথে শিরক করা। এর আরো কয়েকটি দিক উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন- মাজলুমদেরকে অন্যায়ভাবে সপরিবারে দেশ থেকে বহিষ্কার করা, ইবাদতের স্থানসমূহ ধ্বংস করা। এরপর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, কীভাবে কোনো ভূখণ্ড দারুল ইসলাম হয়। আর তা হলো তাতে মুসলমানদের শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে এবং আল্লাহ তাআলার বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়া। [দেখুন— কিতাবুল জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহঃ ১/৬০০]

وَأَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَدِيَارَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ وَأَرْضاً لَمْ تَطَأُوهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيراً

আল্লাহ তোমাদেরকে ওয়ারিশ বানিয়ে দিলেন তাদের ভূমি, তাদের ঘরবাড়ি, তাদের ধন-সম্পদ এবং এমন ভূমির, এখনও যেখানে তোমাদের পা পৌঁছেনি। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। {সুরা আহযাবঃ ২৭}

তো মুসলমানদের বিজিত ভূমি, যেখানে তাদের শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত, তা দারুল ইসলাম। দারুল কুফর নয়।

إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنْتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءتْ مَصِيراً

নিজ সত্তার ওপর জুলুমরত থাকা অবস্থায়ই ফেরেশতাগণ যাদের রুহ কব্‌জা করার জন্য আসে, তাদের উদ্দেশে তারা বলে, তোমরা কিসের মাঝে ছিলে? তারা বলে, যমিনে আমাদেরকে অসহায় করা রাখা হয়েছিলো। ফেরেশতাগণ বলবে, আল্লাহর যমিন কি প্রশস্ত ছিলো না যে, তোমরা তাতে হিজরত করতে?! সুতরাং এরূপ লোকদের ঠিকানা জাহান্নাম এবং তা অতি মন্দ পরিণতি। {সুরা নিসাঃ ৯৭}

যে ভূখণ্ডে মুসলমানদেরকে অসহায় করে রাখা হয়েছে, যেখান থেকে এমন ভূখণ্ডে হিজরত করা ফরজ, যেখানে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত— তা তো নিঃসন্দেহে দারুল হারব। আল্লাহ তাআলার হিজরতের নির্দেশ থেকেও তো দারুল ইসলাম এবং দারুল হারবের বিভক্তি অনুমিত হয়। সারা দুনিয়া একই ভূখণ্ড হলে তবে হিজরতের নির্দেশ কেনো?!

নিচের আয়াতগুলোও দেখা যেতে পারে।

قَالَ الْمَلأ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا مِنْ قَوْمِهِ لَنُخْرِجَنَّكَ يَا شُعَيْبُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَكَ مِنْ قَرْيَتِنَا أَوْ لَتَعُودُنَّ فِي مِلَّتِنَا قَالَ أَوَلَوْ كُنَّا كَارِهِينَ

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِرُسُلِهِمْ لَنُخْرِجَنَّكُمْ مِنْ أَرْضِنَا أَوْ لَتَعُودُنَّ فِي مِلَّتِنَا فَأَوْحَى إِلَيْهِمْ رَبُّهُمْ لَنُهْلِكَنَّ الظَّالِمِينَ

وَلُوطاً إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِنَ الْعَالَمِينَ إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ وَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوهُمْ مِنْ قَرْيَتِكُمْ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ

إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلا فِي الأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعاً يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ وَنُرِيدُ أَنْ نَمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ وَنُمَكِّنَ لَهُمْ فِي الأَرْضِ وَنُرِيَ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا مِنْهُمْ مَا كَانُوا يَحْذَرُونَ

.

রাসুলের যিন্দেগির প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। তৎকালীন মক্কা এবং মদিনার অবস্থা বিশ্লেষণ করলে এবং হিজরতের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বিষয়টা যথাযথভাবে বোধগম্য হয়। তাছাড়া সুন্নাহ এবং সাহাবিদের আসারে আমরা এ বিষয়গুলোর বিবরণ পাই। আমরা তাতে ‘দারুশ শিরক’, ‘দারুস সুন্নাহ’, ‘দারুল হিজরাহ’, ‘দারুল ইসলাম’ (শেষোক্ত তিনটি একই অর্থে) শব্দগুলোর ব্যবহার দেখতে পাই। দৃষ্টান্তস্বরূপ লক্ষ করুন—

عن جابر بن زيد قال قال ابن عباس إن رسول الله صلى الله عليه وسلم وأبا بكر وعمر كانوا من المهاجرين لأنهم هجروا المشركين وكان من الأنصار مهاجرون لأن المدينة كانت دار شرك فجاءوا إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم ليلة العقبة

জাবির ইবনে যায়দ রা. থেকে বর্ণিত, ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. আবু বকর উমর রা. মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কেননা তারা মুশরিকদেরকে ত্যাগ করেছেন। আনসারিদের মধ্যেও মুহাজির ছিলো। কেননা মদিনা একসময় ‘দারুশ শিরক’ ছিলো। লাইলাতুল আকাবায় তারা রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে আসলেন। {সুনানে নাসায়ি, কিতাবুল বাই‘আহ, তাফসিরুল হিজরাহঃ ৭/১৪৪-১৪৫, হাদিস নাম্বারঃ ৪১৬৬}

وإذا لقيت عدوك من المشركين فادعهم إلى ثلاث خصال أو خلال فأيتهن ما أجابوك فاقبل منهم وكف عنهم ثم ادعهم إلى الإسلام فإن أجابوك فاقبل منهم وكف عنهم ثم ادعهم إلى التحول من دارهم إلى دار المهاجرين

…যখন তোমাদের শত্রু মুশরিকদের মুখোমুখি হও, তখন তাদেরকে তিনটি বিষয়ের দিকে আহ্বান করো। তারা যে-কোনোটাকে কবুল করে নিলে তাদের থেকে তা গ্রহণ করে নাও এবং তাদের থেকে নিবৃত্ত থাকো। এরপর তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করো। যদি তারা সাড়া দেয়, তাহলে তাদের থেকে তা গ্রহণ করে নিজেদের হাত গুটিয়ে নাও। এরপর তাদেরকে তাদের ‘দার’ (দারুল হারব) ত্যাগ করে ‘দারুল মুহাজিরিনে’ স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য দাওয়াত দাও। {সহিহ মুসলিমঃ ১৭৩১}

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর বর্ণনায় শব্দটা এভাবে এসেছে—

ثم ادعهم إلى التحول من دارهم إلى دار الإسلام

এরপর তাদেরকে তাদের ‘দার’ (দারুল হারব) ত্যাগ করে ‘দারুল ইসলামে’ স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য দাওয়াত দাও।

عن سليمان بن بريدة أن أمير المؤمنين كان إذا اجتمع إليه جيش من أهل الايمان أمر عليهم رجلا من أهل العلم والفقه فاجتمع إليه جيش فبعث عليهم سلمة بن قيس الأشجعي فقال سر باسم الله قاتل في سبيل الله من كفر بالله فإذا لقيتم عدوكم من المشركين فادعوهم إلى ثلاث خصال ادعوهم إلى الاسلام فإن أسلموا فاختاروا دارهم فعليهم في أموالهم الزكاة وليس لهم في فئ المسلمين نصيب وإن اختاروا أن يكونوا معكم فلهم مثل الذي لكم وعليهم مثل الذي عليكم…الخ

সুলায়মান ইবনে বুরায়দা থেকে বর্ণিত, (পুরোটার অনুবাদে যাচ্ছি না) …যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তোমরা তাদের (হারবিদের) ‘দার’ (দারুল হারব) এখতিয়ার করো। {কিতাবুল খারাজ, ইমাম‌ আবু ইউসুফঃ ২১০; তারিখুত তবারিঃ ৩/২৬০}

عن عبد الله بن عباس أخبره أن عبد الرحمن بن عوف رجع إلى أهله وهو بمنى في آخر حجة حجها عمر فوجدني فقال عبد الرحمن فقلت يا أمير المؤمنين إن الموسم يجمع رعاع الناس وغوغاءهم وإني أرى أن تمهل حتى تقدم المدينة فإنها دار الهجرة والسنة والسلامة وتخلص لأهل الفقه وأشراف الناس وذوي رأيهم قالعمر لأقومن في أول مقام أقومه بالمدينة

…কেননা মদিনা ‘দারুল হিজরাহ’ ‘দারুস সুন্নাহ’ ‘দারুস সালামাহ’। {সহিহ বুখারিঃ ৩৭১৩}

جاء في رسالة خالد بن الوليد في كتاب الخراج ما نصه: “وجعلت لهم – أي أهل الذمة – أيما شيخ ضعف عن العمل، أو أصابته آفة من الآفات، أو كان غنياُ فافتقر، وصار أهل دينه يتصدقون عليه، طرحت جزيته، وعيل من بيت مال المسلمين وعياله، ما أقاموا بدار الهجرة ودار الإسلام، فإن خرجوا إلى غير دار الهجرة ودار الإسلام، فليس على المسلمين النفقة على عيالهم”.

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. এর উপরিউক্ত চিঠিতেও দেখতে পাচ্ছি— …“যতোক্ষণ তারা ‘দারুল হিজরাহ’ – ‘দারুল ইসলামে’ বসবাস করবে। যদি তারা তারা ‘দারুল হিজরাহ’ – ‘দারুল ইসলামে’ ত্যাগ করে অন্য কোনো দিকে মোড় নেয়…। {কিতাবুল খারাজঃ ১৪৪ (অন্য নুসখায়ঃ ১৫৫-১৫৬); কিতাবুল আমওয়াল, আবু উবায়দঃ ৯৮}

عن جرير بن عبد الله رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: ” أنا بريء من كل مسلم يقيم بين أظهر المشركين، قيل يا رسول الله ولمَ؟ قال: لا تراءى ناراهما”.

জারির ইবনে আব্দিল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি সা. বলেছেন, আমি প্রত্যেক এমন মুসলমানের থেকে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিচ্ছি, যে মুশরিকদের মাঝে বসবাস করে। বলা হলো, কেনো হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, তাদের দুই শ্রেণির আগুন একসাথে দেখা যেতে পারে না। { সুনানে তিরমিযিঃ ১৬০৪; সুনানে আবি দাউদ, জিহাদ অধ্যায়; সুনানে নাসায়ি, কাসামাহ অধ্যায়। হাফিজ ইবনে হাজার রহ. বলেন, এর ইসনাদ সহিহ (বুলুগাল মারাম)। শাওকানি রহ. বলেন, এর সনদের রিজাল সিকাহ।}

একই বিষয়ে আরো কয়েকটি হাদিস—

عن معاوية بن أبي سفيان رضي الله عنه قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: “لا تنقطع الهجرة حتى تنقطع التوبة ولا تنقطع التوبة حتى تطلع الشمس من مغربها”

যতোদিন তাওবার সুযোগ থাকবে, ততোদিন হিজরত থাকবে। আর পশ্চিমাকাশ থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত তাওবার সুযোগ বিচ্ছিন্ন হবে না। {সুনানে আবি দাউদঃ ২৪৭৯; মুসনাদে আহমাদ; দারেমি}

عن بهز بن حكيم عن أبيه عن جده أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: “لا يقبل الله عزوجل من مشرك أشرك بعد ما أسلم عملاً أو يفارق المشركين إلى المسلمين”.

ইসলাম গ্রহণ করার পরে যে শিরক করবে আল্লাহ তাআলা এমন মুশরিকের থেকে কোনো আমল গ্রহণ করবেন না, যতোক্ষণ না সে মুশরিকদেরকে ত্যাগ করে মুসলমানদের কাছে হিজরত করে। {সুনানে ইবনে মাজাহঃ ২৫৩৬; মুসনাদে আহমাদ; সুনানে নাসায়ি}

 

প্রসঙ্গঃ দারুল আমান

 

আমরা পূর্বের পর্বগুলোতে সবিস্তারে আলোচনা করে এসেছি, যে ভূখণ্ডে ইসলামের বিধান-সংবিধান প্রতিষ্ঠিত, তা-ই দারুল ইসলাম। এর ব্যাপকতার মধ্যে যা যা অন্তর্ভুক্ত হয়—

১. দারুল হারবের কোনো শহরের অধিবাসীরা যদি ইসলাম গ্রহণ করে নিজেদের শহরেই অবস্থান করে, তবে তাদের ইসলাম গ্রহণের সময় থেকে তা দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়ে যাবে।

২. দারুল হারবের কোনো ভূমি বিজয় এবং তার ওপর ইসলামের বিধিবিধান বাস্তবায়নের ঘোষণার মাধ্যমেও দেশ দারুল ইসলাম হয়। সারাখসি রহ. বলেন, “মুসলমানরা যদি শত্রুদের কোনো ভূমি বিজয় করে এবং তাদের পূর্ণ দখলে আসে, হারবি অধিবাসীরা পলায়ন করে, তবে ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করার দ্বারা তা দারুল ইসলাম হয়ে যাবে।” [শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৩/১০০৪-১০০৬, ৪/১২৫৩, ১২৫৭; আলমাবসুত— ১০/২৩, ১১৪]

৩. দারুল হারবের কোনো শহরের অধিবাসীরা যদি মুসলমানদের সাথে ‘যিম্মাহ চুক্তি’ করে এবং মুসলমানরা তাদের অঞ্চলে ইসলামি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত করে, তবে তাও দারুল ইসলাম।

৪. সন্ধির মাধ্যমে কোনো দেশ বিজিত হলে তার ভূমি থাকবে মুসলমানদের মালিকানায় এবং হারবি অধিবাসীরা খারাজ প্রদান করে সেখানে অবস্থান করতে পারবে— এটাও দারুল ইসলাম হিসেবেই গণ্য হবে।

 

এই চার প্রকারের বাইরে যা-কিছু আছে, সবই দারুল হারব, অন্য শব্দে— দারুল কুফর, দারুশ শিরক। পূর্বের লেখাগুলোতে আমরা পূর্ববর্তী ইমাম ও ফকিহগণের বক্তব্য উল্লেখের পাশাপাশি উস্তাদ আব্দুল কাদির আওদার ভাষায় দারুল হারবের সুন্দর সংজ্ঞা উদ্ধৃত করেছি। তিনি বলেন, “দারুল হারব প্রত্যেক এমন অনৈসলামিক রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা মুসলমানদের শাসনব্যবস্থার অধীনে প্রবেশ করেনি, কিবা যেখানে ইসলামের বিধান প্রকাশিত নয়। এ রাষ্ট্রগুলো একই সরকারের পরিচালনাধীন থাক কিবা ভিন্ন ভিন্ন সরকারের— সবই সমান। তার স্থায়ী নাগরিকদের মাঝে মুসলমানরা থাকা বা না থাকা সবই সমান; যতোদিন তারা ইসলামের বিধান প্রতিষ্ঠিত করতে অক্ষম থাকে।” [আততাশরিউল জিনায়ি আলইসলামি— ১/২৭৭]

 

আমরা আরো আলোচনা করে এসেছি— দারুল হারব মানে যুদ্ধবিদ্ধস্ত বা যুদ্ধে লিপ্ত রাষ্ট্র নয়। অনেকে ভাবেন, দারুল হারব শুধু এমন রাষ্ট্রকেই বলা হয়, যা কোনো মুসলিম ভূখণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। বাস্তবতা এমন নয়। কোনো ভূখণ্ডে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলে তাকে দারুল ইসলাম বলা হয় (বিস্তারিত জানতে পূর্বের পর্বগুলো দ্রষ্টব্য) আর কোথাও কুফরি এবং শিরকি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলে তাকে দারুল হারব বলা হয়। দারুল হারবকে অন্য শব্দে— দারুল কুফর, দারুশ শিরক ইত্যাদিও বলা হয়। এসব পরিভাষার মাঝে কোনো বিরোধ নেই। ফকিহগণ দারুল হারবের যে সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন, তার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বিষয়টা অস্পষ্ট থাকার কথা নয়। এজন্যই সারাখসি রহ. বলেন, “দারকে আমাদের দিকে বা তাদের দিকে নিসবত করাটা মূলত ক্ষমতা এবং প্রাধান্যতার বিচারে।’’ [আলমাবসুত, সারাখসি— ১০/১১৪]

এ বিষয়টাকেই আল্লামা কাসানি রহ. আরো বিস্তারিত করে এভাবে বলেছেন, “কোনো রাষ্ট্রে কুফরের আহকাম-বিধিবিধান প্রকাশিত হলে তা দারুল কুফর হয়ে যায়।… রাষ্ট্র শুধু কুফরের বিধানাবলী প্রকাশিত হওয়ার দ্বারাই দারুল কুফর বলে গণ্য হয়।” [বাদায়িউস সানায়ি— ৯/৪৩৭৫; আরো দেখুন— আহকামুদ দিয়ার, আবিদ সুফয়ানি— ১৫]

বোঝা গেলো, কোনো রাষ্ট্র দারুল হারব (অন্য শব্দে— দারুল কুফর, দারুশ শিরক) হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য লড়াই-যুদ্ধ চলমান থাকা অপরিহার্য নয়। এজন্যই হাম্বলি ফকিহগণ বলেন, “হারবি শব্দটা হারবের দিকে সম্পর্কিত। হারব অর্থ— কিতাল (লড়াই), তেমনি এর অর্থ দূরত্ব এবং বিদ্বেষও। তো দারুল হারব অর্থ হলো এমন রাষ্ট্র, যার সাথে মুসলমানদের দূরত্ব কিবা মুসলমানদের প্রতি রয়েছে যার বিদ্বেষ। হারবিকে হারবি এই দ্বিতীয় অর্থ, তথা দূরত্ব এবং বিদ্বেষ— এর বিচারেই বলা হয়। কার্যত যুদ্ধে লিপ্ত থাকা জরুরি নয়। [আলমুতলি’ আলা আবওয়াবিল মুকনি’, বা’লি— ২২৬]

 

উম্মাহর ফকিহগণের আলোচনা থেকে তো স্পষ্ট অনুমিত হয়, দারুল ইসলাম এবং দারুল হারবের বাইরে আর কোনো বিভক্তি তাদের দৃষ্টিতে ছিলো না। সমগ্র পৃথিবী দু’ভাগে বিভক্ত; একভাগের নাম দারুল ইসলাম, আরেক ভাগের নামের দারুল হারব। তৃতীয় আর কিছু নেই। এ ব্যাপারে উম্মাহর বিদগ্ধ ফকিহণের ঐকমত্য রয়েছে। এখানে আমরা দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েকজনের বক্তব্য উদ্ধৃত করছি।

 

কাজি আবু ইয়া’লা রহ. বলেন, “প্রত্যেক এমন ভূখণ্ড যেখানে বিজয় কুফরের নয়, ইসলামের বিধান-সংবিধানের, তা দারুল ইসলাম। আর প্রত্যেক এমন ভূখণ্ড যেখানে বিজয় ইসলামের নয়, কুফরেরর বিধান-সংবিধানের, তা দারুল কুফর। ব্যতিক্রম হলো গোমরাহ কাদারিয়্যাদের বক্তব্য। তারা বলে, যে ভূখণ্ডে পাপিষ্ঠদের প্রাধান্য, কাফির বা মুসলিমদের নয়, তা দারুল কুফর নয়, দারুল ইসলামও নয়; তা হলো দারুল ফিস্‌ক। এ বক্তব্যের ভিত্তি হলো, তাদের সেই মূলনীতি— ‘মানযিলাতুন বাইনাল মানযিলাতাইন’ (ইসলাম এবং কুফরের মাঝে আরেকটি স্তর)। আমাদের দলিল ইমানের অধ্যায়ে বিগত হয়েছে। শরিয়তের মুকাল্লাফ যারা তাদের তো এ কয়েকটি অবস্থাই হতে পারে—

১. কাফির

২. মুমিন— পরিপূর্ণ ইমানের অধিকারী বা ত্রুটিপূর্ণ ইমানের অধিকারী।

তো সকল মানুষ হয়তো মুমিন, কিবা কাফির। এমন তো হতে পারে না যে, কোনো শরিয়তের মুকাল্লাফ মানুষ মুমিনও নয়, আবার কাফিরও নয়। (উল্লেখ্য, মুনাফিক আলাদা কিছু নয়। তারা তো কাফিরদের সর্বনিম্ন শ্রেণি। চিরস্থায়ী জাহান্নামী। জাহান্নামের সবচে নিম্নসতরে হবে তাদের বসবাস।) তেমনিভাবে ‘দার’ও দুই অবস্থা থেকে মুক্ত হবে না। হয়তো তা দারুল কুফর হবে, কিবা তা দারুল ইসলাম হবে। {আলমু’তামাদ ফি উসুলিদ দীন, আবু ইয়া’লাঃ ২৭৬}

 

আল্লামা ইবনু মুফলিহ রহ. বলতেন, “প্রত্যেক এমন ভূখণ্ড, যেখানে ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত, তা দারুল ইসলাম। আর যদি কোনো ভূখণ্ডে কুফরি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত থাকে, তাহলে তা দারুল কুফর। এদু’য়ের বাইরে আর কোনো দার নেই।’’ {আরো দেখুন— আহকামু আহলিয যিম্মাহ, ইবনুল কায়্যিমঃ ১/৪৭৫-৪৭৬}

 

হাঁ, তৃতীয় আরেকটি ‘দারে’র অস্তিত্বের বর্ণনা আমরা পাই ইউরোপীয় ও প্রাচ্যবিদ গবেষকদের কাছে। তারা এটাকে ‘দারুল আহ্‌দ’ নামে, কেউ ‘দারুল আমান’ নামে, কেউ ‘দারুল মুওয়াদায়াহ’ নামে উল্লেখ করেন। {দেখুন— ইকতিশাফুল মুসলিমিন লি উরুব্বা, বার্নাড লুইসঃ ৬৯; আততাকসিমুল ইসলামি লিল মা’মুরাহ, ড. মুহিউদ্দিন কাসিম; ৪৯; মানহাজুল ইসলাম ফিল হারব ওয়াস সালাম, ড. উসমান জুমআহ যামিরিয়্যাহঃ ৫৮}

সর্বপ্রথম আমরা এই বন্টন দেখতে পাই ‘দায়িরাতুল মা’আরিফ আলইসলামিয়া’র (Islamic Encyclopedia) লেখকদের কাছে। এরপর বিদগ্ধ গবেষকদের মধ্যে এই আলোচনার সূত্রপাত করেন ড. নজিব (আশশারুদ দুওয়ালি ফিল ইসলামঃ ৫০)। তারপর একে আরো শক্তিশালী করেন শায়খ আবু যুহরা (আলআলাকাতুদ দুওয়ালিয়্যাহঃ ৫৫; নাযরিয়্যাতুল হারবঃ ১৪)। একই চিন্তা লালন করেন ড. ওয়াহবা যুহায়লি, ড. মুহাম্মাদ দাসুকি, ড. আব্দুল হামিদ আলহাজ, ড. মাজিদ, উস্তাদ আল্লাল আলফাসি আলমাগরিবি

{দেখুন— আসারুল হারবঃ ১৭৫-১৭৬; আলআলাকাতুদ দুওয়ালিয়্যাহঃ ১০৭-১০৮; আলইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ওয়া আসারুহু ফিল ফিকহঃ ৩৩০; আননুযুমুদ দুওয়ালিয়্যাহঃ ১৮২-১৮৩; আলকানুনুদ দুওয়ালি আলইসলামিঃ ২২-২৩; মাকাসিদুশ শারিয়াহ ওয়া মাকারিমুহাঃ ২২৯}

 

আমাদের ইমামগণের মতে দারুল হারব দুই প্রকার।

 

১. এমন দারুল হারব, যার সঙ্গে মুসলমানদের কোনো চুক্তি নেই। এটা হলো দারুল খাওফ— অর্থাৎ, ভয়ের শহর। যেখানে মুসলমানরা নিরাপদ নয়।

২. এমন দারুল হারব, যার অধিবাসীরা মুসলমানদের সঙ্গে মুসলমানদের নিরাপত্তা চুক্তি করেছে। এটাকে আমরা দারুল আমান, দারুল আহদ বা দারুল মুওয়াদাআহ বলতে পারি। এই রাষ্ট্র যদিও ইসলামি রাষ্ট্র নয়, কিন্তু সেখানে চুক্তির কারণে মুসলমানরা নিরাপদ। যেমন ছিলো রাসুলের যুগে নাজাশির রাষ্ট্র হাবাশাহ (ইথিওপিয়া)।

দ্বিতীয় প্রকারটিকেও আমাদের মহান ইমামগণ দারুল হারবের মাঝেই গণ্য করেছেন। তারা এটাকে স্বতন্ত্র কোনো ‘দার’ নয়, বরং দারুল হারব গণ্য করেই এর ভিত্তিতে অনেক মাসআলা এবং ফতোয়া প্রদান করেছেন।

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বলেন, “দারুল হারবের দেশসমূহের কোনো দেশের অধিবাসীরা যদি মুসলমানদের সঙ্গে এই মর্মে চুক্তবদ্ধ হয়, তারা প্রতি বছর মুসলমানদের খারাজ বা নির্দিষ্ট পরিমাণ অন্য কোনো কর প্রদান কর প্রদান করবে এই শর্তে যে, মুসলমানরা তাদের ওপর ইসলামের বিধিবিধান প্রয়োগ করবে না, এবং তারা যিম্মিও হয়ে যাবে না— এরপর তাদের কেউ এই চুক্তির ভিত্তিতে অনেক ধনসম্পদ নিয়ে দারুল ইসলামের উদ্দেশে বের হয়, তাহলে সে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত।”

ইমাম সারাখসি রহ. এর ইল্লত (Cause) বর্ণনা করেন, “যে লোকটি দারুল ইসলামের উদ্দেশে বেরিয়েছে, সে তার অবস্থানুযায়ী হারবি, যিম্মি নয়, তবে সে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত। কেননা চুক্তিবদ্ধ নাগরিকদের ওপর ইসলামের বিধান প্রয়োগ হয় না। … এই চুক্তির দ্বারা তাদের দেশ দারুল ইসলাম হয়ে যায়নি, যেহেতু সেখানে ইসলামের বিধিবিধান কার্যকর করা হয়নি। তা দারুল হারবই থেকে যায়।” {আসসিয়ারুল কাবির মা’আ শরহিস সারাখসিঃ ৫/২১৫৭, ২১৬৫}

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. আরো বলেন, “চুক্তিকারীদের কোনো নাগরিক তাদের দেশে (দারুল মুওয়াদাআহ-তে) অপর কোনো নাগরিককে হত্যা করলে তার ওপর কিসাস কার্যকর হবে না। আর যদি আমাদের রাষ্ট্রে (দারুল ইসলামে) কোনো মুসতামিন অপর কোনো মুসতামিনকে হত্যা করে, তবে তার ওপর কিসাস অপরিহার্য হবে।”

ইমাম সারাখসি রহ. এর ইল্লত (Cause) বর্ণনা করেন, “কেননা চুক্তিকারীরা ইসলামের বিধিবিধান নিজেদের ওপর অপরিহার্য করে নেয়নি। কেননা তারা চুক্তিই করেছে এই মর্মে যে, তাদের ওপর ইসলামের বিধিবিধান কার্যকর করা হবে না। তাই তাদের রাষ্ট্র পূর্বের মতো দারুল হারবই থাকবে।” {আসসিয়ারুল কাবির মা’আ শরহিস সারাখসিঃ ৫/১৮৫৭, ১৮৯৩}

তিনি আরো বলেন, “কেননা যখন তারা ইসলামের বিধানের সামনে নতি স্বীকার করেনি, তখন চুক্তি করার দ্বারা চুক্তিকারী হলেও তারা ‘হারবি’র কাতার থেকে বেরিয়ে যায়নি। তুমি দেখছো না, কৃত চুক্তির মেয়াদ গত হলেই তো পুনরায় তারা (কাট্টা) হারবিই হয়ে যাবে।” {শরহুস সিয়ারিস সগির, আলমাবসুতের অন্তর্ভুক্তঃ ১০/৮৮-৮৯, ৯৭}

 

আধুনিক বিশ্লেষকদের বক্তব্যের সারকথা 

 

এবার আমরা বর্তমান বিশ্লেষকগণের বক্তব্যের দিকে একটু দৃষ্টিপাত করি। সংক্ষিপ্ত পরিসরে সবার বক্তব্য উদ্ধৃত করা তো সম্ভব নয়। তাই সূত্রগুলো উল্লেখ করে দিয়েছি। কেউ চাইলে সেখান থেকে দেখে নিতে পারবে। তবে সংক্ষেপে তাদের বক্তব্যগুলোর মৌলিক কয়েকটি পয়েন্টের পর্যালোচনা উল্লেখ করার প্রয়াস পাবো।

১. তৃতীয় কোনো ‘দার’ এর অস্তিত্ব গণ্য করা মহান ইমাম এবং ফকিহণের ঐকমত্যের বিপরীত। সন্ধিকারীরা ইসলামের বিধিবিধানের অনুগত হলে তাদের রাষ্ট্র ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবেই গণ্য হবে, তাতে মুসলমানের সংখ্যা যতো কমই হোক কিবা মোটেও তাদের অস্তিত্ব না থাক। আর যদি তারা ইসলামের বিধান-সংবিধান এবং ইসলামি শাসনক্ষমতার সাথে একমত না হয়, তাহলে তা দারুল হারব। এর বাইরে আর কোনো সুরত নেই।

২. কেউ কেউ ইমাম শাফেয়ি এবং তার শাগরেদদের বক্তব্য দ্বারা এই তৃতীয় ‘দার’কে প্রমাণ করতে চান। ইমাম শাফেয়ি তো এক্ষেত্রে বড়ই মাজলুম। পূর্বের পর্বে আলোচনা করে এসেছি, একশ্রেণির অথর্ব ইমাম শাফেয়ির বক্তব্য বিকৃত করে পুরো দুনিয়াকে এক ‘দার’ হিসেবে অভিহিত করতে চায়। তারা দারুল ইসলাম এবং দারুল হারবের বিভক্তিকেই স্বীকার করে না। এই আরেক শ্রেণি তার বক্তব্যকে অপাত্রে প্রয়োগ করে, পুরো দুনিয়াকে তিন ‘দার’ বানাতে চায়। তবে মজার বিষয়, তারা তার বক্তব্যকে হুবহু উদ্ধৃত করেন না। এই অভিমতকে শুধু তার দিকে নিসবত করেই ক্ষান্ত হন। আল্লাহ জানেন, সামনে কে এসে কীভাবে আরো বিকৃত করে।

৩. কেউ কেউ তো ইমাম মুহাম্মাদ এবং কাজি আবু ইয়া’লা রহ. এর দিকেও এই সারহীন অভিমতকে নিসবত করে। ওপরে তো আমরা তাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য উল্লেখ করেই এসেছি। কাজি আবু ইয়া’লা রহ. তো পরিষ্কার ভাষায় তৃতীয় ‘দারে’র অস্তিত্ব অস্বীকার করছেন।

৪. কেউ ইবনে তাইমিয়া রহ. এর একটি ফতোয়াকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন। আমাদের এই সিরিজের তৃতীয় পর্বে আমরা সে সম্পর্কে আলোচনা করে এসেছি।

৫. কেউ মাওয়ারদি রহ. এর একটি বক্তব্য থেকে ভুল বুঝে বা অপাত্রে প্রয়োগ করেও এই মাকসাদ হাসিল করেছেন। তবে এই তৃতীয় ‘দারে’র অস্তিত্বের প্রথম ঘোষক প্রাচ্যবিদ মহোদয়গণ এতোটা বে-ইনসাফ হননি। তারা পর্যন্ত মাওয়ারদি রহ. এর বক্তব্য দ্বারা যে তৃতীয় কোনো ‘দারে’র অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না— স্বীকার করেছেন।

৬. হাবাশাকে তৃতীয় ‘দারে’র পক্ষে প্রমাণস্বরূপ উল্লেখ করা ইলমি অগভীরতার প্রমাণ বহন করে। কেননা হাবাশায় ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত ছিলো না, তাই তা দারুল হারব। হাঁ, সেখানে মুসলমানদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে। এর কারণে তা দারুল হারব থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। কেননা আমরা ওপরে বলে এসেছি, দারুল হারব দু’ধরনের— দারুল খাওফ (যেখানে মুসলমানরা নিরাপদ নয়) এবং দারুল আহদ, দারুল মুওয়াদাআহ বা দারুল আমান (যেখানে মুসলমানরা নিরাপদ)।

 

‘দারে’র ভিন্নতার কারণে আহকামের ভিন্নতা

 

‘দারে’র ভিন্নতার কারণে কি আহকামে ভিন্নতা আসে? দারুল ইসলামের বিধান এবং দারুল হারবের বিধান কি অভিন্ন থাকে না ভিন্ন হয়?

এ মাসআলার সমাধানে ইমামগণের দু’ধরনের অভিমত।

১. ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর মতে ‘দারে’র ভিন্নতা আহকামের ভিন্নতা অপরিহার্য করে। কেননা বাস্তবে কিবা হুকুমের বিচারে (এর ব্যাখ্যা সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ) ‘দার’ ভিন্ন হওয়াটা মৃত্যুর সমপর্যায়ের। আর মৃত্যু মালিকানা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তেমনি ‘দারে’র ভিন্নতাও মালিকানা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কেননা মালিকানা সাব্যস্ত হয় অধিকৃত বস্তুর ওপর কবজার দ্বারা। আর বাস্তবে কিবা হুকুমের বিচারে ‘দার’ ভিন্ন ভিন্ন হওয়া কবজার যোগ্যতা নষ্ট করে দেয়। বাস্তবে কবজা নষ্ট হয় মালিকের অধিকার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। আর হুকুমের বিচারে কবজা নষ্ট হয় ব্যক্তির হাত থেকে হস্তক্ষেপের অধিকার বিনষ্ট হওয়ার মাধ্যমে।

২. ইমাম শাফেয়িসহ অধিকাংশ ইমামের মতে ‘দারে’র ভিন্নতা আহকামে ভিন্নতা আনে না। কেননা ‘দার’ আর জায়গার তো কোনো আহকাম নেই। আহকাম তো সব আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত। আর ইসলামের দাওয়াত কাফিরদের ওপরও ব্যাপক, তারা তাদের দেশে থাক কিবা অন্য কোথাও। {তাখরিজুল ফুরু’ আলাল উসুল, যানজানি— ২৭৭-২৮৭; তাসিসুন নাযার, দাবুসি— ৭৯-৮০; বাদায়িউস সানায়ি’— ৯/৪৩৭৬}

এই ব্যাপক উসুলের আলোকে অগণিত শাখা এবং অসংখ্য মাসায়িল বের হয়। কিছু আহকাম পররাষ্ট্রনীতির সাথে সম্পৃক্ত আর কিছু স্বরাষ্ট্রনীতির সাথে সম্পৃক্ত। আমরা এখানে একটি ব্যাপক মূলনীতি এবং কয়েকটি মাসআলা আলোচনা করবো, যার বিধান ‘দারে’র ভিন্নতার কারণে পরিবর্তিত হয়।

 

দারুল হারবে অবস্থানরত হারবিদের সাথে মুসলমানদের আচরণ-রীতি

 

দারুল হারবে ‘আমান’ (নিরাপত্তা) নিয়ে প্রবেশকারী মুসলমানের আচরণ-রীতি এবং মুআমালা কেমন হবে সে সম্পর্কে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. একটি ব্যাপক মূলনীতি বলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “কোনো মুসলমান ব্যক্তি ‘আমান’ নিয়ে যখন দারুল হারবে প্রবেশ করে, তখন তার জন্য এই নিরাপত্তাচুক্তি লঙ্ঘন করা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং তাদেরকে ধোঁকা দেয়া বৈধ নয়। তার ওপর অপরিহার্য তাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করা, যেমনিভাবে তারা তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করে। আর সে যখন তাদের হাতে বন্দি হিসেবে থাকবে, তখন সে ‘আমান’ গ্রহণকারী নয়। তার অধিকার আছে, সে যতো পারে তাদেরকে হত্যা করবে, যতোটুকু পারে তাদের ধনসম্পদ ছিনিয়ে নিবে।” {কিতাবুল আসল, সিয়ার অধ্যায়— ১৩৮; আসসিয়ারুল কাবির— ৪/১৪৮৬}

হানাফি ফকিহগণ ইমাম মুহাম্মাদের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন— যখন কোনো মুসলমান ব্যবসা বা অন্য কোনো কাজে ‘আমান’ নিয়ে দারুল হারবে প্রবেশ করে, তখন তার জন্য তাদের জান মাল বা সম্মানের কোনো ক্ষতি করা বৈধ নয়। কেননা যখন সে ‘আমান’ নিয়ে প্রবেশ করেছে, তখন তার এই ‘আমানে’র মাঝেই এ বিষয়টা রয়েছে যে, সে তাদেরকে ধোঁকা দিবে না, তাদের কোনোপ্রকার ক্ষতি করবে না, তাদের মনোতুষ্টি ছাড়া তাদের মালিকানাধীন কোনোসম্পদ ভোগদখল করবে না। যখন সে এর ব্যতিক্রম করলো, তখন তো নিরাপত্তাচুক্তি লঙ্ঘন এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ হিসেবে ধর্তব্য হবে। এ তো সুস্পষ্ট হারাম। অসংখ্য নসে এর নিষিদ্ধতা বর্ণিত হয়েছে। যদি সে তাদেরকে ধোঁকা দিয়ে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে আনে, এবং দারুল ইসলামে তা নিয়ে প্রবেশ করে তাহলে জেনেশুনে কোনো মুসলমানের জন্য তার থেকে সেই বস্তু কেনা জায়িয নয় (মাকরুহে তাহরিমি)। কেননা সে নিষিদ্ধ পন্থায় এই বস্তুর মালিকানা লাভ করেছে। এটা খাবিস উপার্জন। সদকা করার দ্বারা নিজের মালিকানা থেকে বের করে দেয়া ওয়াজিব।

তবে এই মূলনীতির থেকে ব্যতিক্রম ক্ষেত্রও রয়েছে, যখন সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া, হারবি হত্যা করা জায়িয হয়ে যায়, তবে সেক্ষেত্রেও সম্ভ্রমহানি করা যাবে না। এটা তখন, যখন কাফিরদের সরকার তাকে ধোঁকা দিয়ে বন্দি করে অথবা তার অর্থসম্পদ ছিনিয়ে নেয়, অথবা রাষ্ট্রের প্রজাদের কেউ তাকে ধোঁকা দেয়, কিন্তু সরকারপ্রধান অপরাধীকে বারণ করে না, তাহলে এটাও সরকারের সম্মতিতে সংঘটিত হয়েছে বলেই ধর্তব্য হবে, তখন এই মুসলমানের জন্য হারবিদেরকে হত্যা করা, তাদের ধনসম্পদ ছিনিয়ে নেয়া বৈধ হবে।

{দেখুন— আলমাবসুত— ১০/৬৫, ৯৬; শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৪/১১৫-১১৬; আররাদ্দু আলা সিয়ারিল আওযায়ি— ১২৬; আলহিদায়াহ ওয়া শুরুহুহা— ৪/৩৪৭-৩৪৮; মাজমাউউল আনহুর এবং আদদুররুল মুনতাকা— ১/৬৫৫; আলফাতাওয়াল হিন্দিয়া— ২/২৩২; তাবয়িনুল হাকায়িক— ৩/২৬৬; আলফুরুক, কারাবিসি— ১/৩২৫, ৩২৭; রাদ্দুল মুহতার— ৪/১৬৬; আললুবাব শরহুল কিতাব— ৩/১৩৪-১৩৫; ইখতিলাফুল ফুকাহা, তাবারি— ৬৩, ১৯২-১৯৪}

 

প্রসঙ্গঃ দারুল হারবে সুদের লেনদেন

 

পূর্বের পোস্টে আমরা ‘দারে’র ভিন্নতার কারণে আহকামের ভিন্নতা এবং দারুল হারবে হারবিদের সাথে মুসলমানদের আচরণরীতি সম্পর্কে আলোচনা করেছি এবং সেখানে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর বর্ণিত ব্যাপক মূলনীতি উদ্ধৃত করেছি। তার আলোকে আমরা ইনশাআল্লাহ ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি মাসআলা আলোচনা করবো। আজ আলোচ্যবিষয়— “দারুল হারবে সুদের লেনদেন”।

(উল্লেখ্য, বাংলা সুদের থেকে আরবি ‘রিবা’ শব্দটি অনেক ব্যাপক। এখানে বোঝার সুবিধার্থে সুদ শব্দ উল্লেখ করা হলো। এদুয়ের মাঝে পার্থক্য জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট স্থানে দ্রষ্টব্য।)

‘দারে’র ভিন্নতার কারণে আহকামে ভিন্নতা আসে কি না সেই ইখতিলাফের ভিত্তিতে এই মাসআলায় ইমামগণের দু’ধরনের অভিমত রয়েছে। তবে কিছু বিষয়ে তাদের সকলের ঐকমত্যও রয়েছে। মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে আমরা উভয় ফরিকের ঐকমত্যের ক্ষেত্রগুলোর দিকে একবার দৃষ্টিপাত করি।

ক. সকল ইমাম ও ফকিহের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত— দারুল ইসলামে মুসলমানের জন্য সুদি লেনদেন করা বৈধ নয়, এবং এমন স্থানেও তা বৈধ নয়, যেখানে মুসলমানদের বিধিবিধান চলে, যেমন দারুল হারবে অবস্থানরত মুসলিম সেনাদল। চাই উক্ত লেনদেন কোনো মুসলমানের সাথে করা হোক, কিবা কোনো যিম্মি বা মুসতামিন (দারুল ইসলামে অবস্থানরত নিরাপত্তাগ্রহণকারী হারবি) এর সাথে। কেননা কোনো মুসলমানের জন্য অমুসলিমদের সাথে শুধু সে লেনদেনগুলোই বৈধ, যা মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে বৈধ।

খ. তেমনি সকল ইমাম ও ফকিহের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত— দারুল হারবে কোনো মুসলমানের জন্য হারবিকে সুদ দেয়া বৈধ নয়, যেমনিভাবে দারুল ইসলামে তা বৈধ নয়। আর দারুল হারবে অবস্থানরত মুসলমানদের সাথে তার আচরণবিধি ঠিক তেমনই হবে, যেমন দারুল ইসলামে অবস্থানরত মুসলমানদের সাথে হয়। কেননা মুসলমান যেখানেই থাক, সে অবশ্যই ইসলামের বিধিবিধান মান্যকারী।

এরপর তৃতীয় বিষয়টিতে এসে ইমামগণের মাঝে মতানৈক্য হয়ে গেছে। কোনো মুসলমান যদি ‘আমান’ নিয়ে দারুল হারবে প্রবেশ করে, এরপর হারবিদের সাথে সুদি চুক্তিতে ক্রয়-বিক্রয় বা অন্য কোনো লেনদেন করে আর সে হারবিদের থেকে সুদ গ্রহণ করে— এ সুরতে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মুহাম্মাদ, ইমাম আহমদের একটি বর্ণনা (শরহুয যারকাশি দ্রষ্টব্য, ইবনে তাইমিয়া রহ. এর ঝোঁকও এই বর্ণনার দিকে অনুমিত হয়।) এবং আরো কিছু সালাফের মতে, যেমন ইবরাহিম নাখয়ি, ইবনুল মাজিশুন এবং অন্য আরো ক’জনের মতে তা বৈধ হবে।

আর অধিকাংশ ইমাম ও ফকিহের মতে তা বৈধ নয়। নিচে আমরা ইমামগণের বক্তব্য এবং উভয় ফরিকের মৌলিক দলিলগুলোর প্রতি আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো।

 

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর অভিমত

 

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বলেন, “মুসলমান যখন ‘আমান’ নিয়ে দারুল হারবে প্রবেশ করে, তখন তার জন্য হারবিদের মনোতুষ্টির সাথে তাদের সম্পদ গ্রহণ করা বৈধ— তা যে-কোনো পন্থায়ই হোক।” {আসসিয়ারুল কাবির— ৪/১৪১০, ১৪৮৬; কিতাবুল আসল, সিয়ার অধ্যায়— ১৮১}

ইমাম সারাখসি রহ. এর ইল্লত (Cause) বর্ণনা করেন, “কেননা ‘আমান’ নিয়ে প্রবেশ করার দ্বারাই তো আর হারবিদের অর্থসম্পদ সংরক্ষিত (معصوم) হয়ে যায় না। তবে সে ‘আমান’ চুক্তির দ্বারা এ অঙ্গীকার করে নিয়েছে যে, সে খেয়ানত করবে না। এজন্য খেয়ানত থেকে বেঁচে থাকা তার ওপর অপরিহার্য। যে-কোনো পন্থায় সে তাদের মনোতুষ্ট করে অর্থসম্পদ গ্রহণ করলে সে তো বৈধ পন্থায় তা গ্রহণ করেছে বলেই বিবেচিত হবে। সে কোনো ধোঁকা-প্রতারণার তো আশ্রয় নেইনি। এজন্য তার জন্য সেই সম্পদ পবিত্র বলে বিবেচিত হবে। বন্দি এবং ‘আমান’গ্রহণকারী উভয়ের এক্ষেত্রে একই বিধান। এমনকি সে যদি এক দিরহামের বিনিময়ে দুই দিরহাম গ্রহণ করে, কিবা অর্থের বিনিময়ে মৃত বস্তু বিক্রি করে, অথবা কিমার-জুয়ার পন্থায় তাদের থেকে অর্থসম্পদ গ্রহণ করে— এ সবই তার জন্য বৈধ বলে বিবেচিত হবে।

এটা পুরোটাই ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর অভিমত।

ইমাম সুফয়ান সাওরি রহ. বলেন, বন্দি মুসলিমের জন্য তা তো বৈধ হবে; কিন্তু ‘আমান’গ্রহণকারী মুসলিমের জন্য তা বৈধ হবে না। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এরও একই মত।

তাদের জবাবে আমরা বলবো, বন্দির থেকে ‘আমান’গ্রহণকারীর বিধানের ভিন্নতা তো শুধু হারবিদের মনোতুষ্টি ছাড়ার অর্থসম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে। মনোতুষ্টির সাথে অর্থসম্পদ গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘আমান’গ্রহণকারীর বিধান বন্দির মতোই। কেননা তার ওপর শুধু এতোটুকু অপরিহার্য, সে তাদেরকে ধোঁকা দিবে না। আর মনোতুষ্টির সাথে অর্থসম্পদ গ্রহণের মাঝে তো কোনো ধোঁকা নেই। {শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৪/১৪১০-১৪১১}

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. আরো বলেন, “আমানগ্রহণকারী যদি তাদের কাছে এক বছর মেয়াদে দুই দিরহামের বিনিময়ে এক দিরহাম বিক্রি করে, এরপর আমাদের রাষ্ট্রে চলে আসে, তারপর পুনরায় তাদের কাছে ফিরে যায় অথবা সেই বছর চলে এসে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গিয়ে দিরহাম গ্রহণ করে, তাহলে কোনোই সমস্যা নেই। কেননা মুসলমানদের বিধিবিধান ওখানে চলে না। {আসসিয়ারুল কাবির— ৪/১৪৮৬; কিতাবুল আসল, সিয়ার অধ্যায়— ১৮১; শরহু মুশকিলিল আসার, তাহাবি— ৮/২৪৮}

ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন, কোনো মুসলমান যদি ‘আমান’ নিয়ে দারুল হারবে প্রবেশ করে, এরপর তাদের কাছে দুই দিরহামের বিনিময়ে এক দিরহাম বিক্রি করে, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। কেননা মুসলমানদের বিধিবিধান তাদের ওপর প্রয়োগ হবে না। তাই তাদের সন্তুষ্টির সাথে যে-কোনো উপায়ে তাদের সম্পদ গ্রহণ করে, তা বৈধ। {কিতাবুর রদ আলা সিয়ারিল আওযায়ি; কিতাবুর রাদ আলা মুহাম্মাদ, কিতাবুল উম— ৭/৩৭৮-৩৭৯}

এবার আমরা তাদের দলিলগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করি। এই মাসআলার ভিত্তি হাদিস আসার এবং কিয়াসের ওপর। ধারাবাহিকভাবে সবগুলো উল্লেখ করা হচ্ছে।

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর দলিল

 

১ম দলিল—

ألا وإن كل ربا في الجاهلية موضوع لكم رءوس أموالكم لا تظلمون ولا تظلمون غير ربا العباس بن عبد المطلب فإنه موضوع كله

রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, শোনো, জাহেলি যুগের সুদ বিলুপ্ত। তোমরা মূলধন পাবে। তোমরা জুলুম করবে না। তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না। তবে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদের কথা ভিন্ন। কেননা তা পুরোটাই বিলুপ্ত। {সহিহ মুসলিম— ১২১৮ (১৪৭); সুনানে ইবনে মাজাহ— ৩০৭৪; সুনানে তিরমিযি— ৩০৮৭। ইমাম তিরমিযি বলেন, এই হাদিসটি হাসান সহিহ।}

আব্বাস রা. এর ইসলামগ্রহণের সময় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভিন্নতা রয়েছে। কেউ বলেন, তিনি বদর যুদ্ধের পূর্বে ইসলামগ্রহণ করেছেন। আর কারো বক্তব্য হলো, বদরযুদ্ধে তিনি বন্দি হয়েছেন। এরপর ইসলামগ্রহণ করেছেন। অনন্তর রাসুলুল্লাহ সা. সকলের অনুমতি নিয়ে তাকে মক্কায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তো ইসলামগ্রহণের পর থেকে পর্যন্ত তিনি মক্কায় অবস্থানরত ছিলেন। মক্কা বিজয় পর্যন্ত সেখানে তিনি সুদি লেনদেন করতেন। অথচ সুদ হারাম হওয়ার বিধান মক্কা বিজয়ের অনেক আগেই নাযিল হয়েছে। খায়বারের দিন রাসুলুল্লাহ সা. দুই সাদ রা. (সাদ ইবনে আবি ওয়াককাস এবং সাদ ইবনে উবাদা) এর উদ্দেশ্যে বলেছেন—

أربيتما فردا

তোমরা সুদি লেনদেন করেছো। তাই ফিরিয়ে দাও। {মুয়াত্তা মালিক— ২/৬৩২; আততামহিদ— ২৪/১০৬; শরহুয যারকানি— ৩/২৭৬। উল্লেখ্য, কারো কারো বর্ণনায় দিনটিকে হুনায়নের দিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন— গাওয়ামিযুল আসমা, ইবনে বাশকুওয়াল— ২০২}

তাছাড়া পবিত্র কোরআনের আয়াত—

ياأيُّها الَّذين آمنوا لا تأكلوا الرِّبا أضعافاً مُضاعفة

হে ইমানদারগণ, তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেও না। {সুরা আলে ইমরান— ১৩০}

এই আয়াত মক্কা বিজয়ের অনেক পূর্বে উহুদ যুদ্ধের সময়ে নাযিল হয়। এরপরও মক্কা বিজয়ের সময় রাসুলুল্লাহ সা. আব্বাস রা. এর লেনদেনগুলোকে বাতিল ঘোষণা করেননি, শুধু সেগুলো ছাড়া, যার কবজা পূর্ণ হয়নি— এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দারুল হারবে মুসলমান এবং হারবির মাঝে সুদি লেনদেন বৈধ। আর কবজা করার পূর্বেই সেই ভূমি দারুল ইসলাম হয়ে গেলে চুক্তি নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। {শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৪/১৪৮৭-১৪৮৮}

ইবনে আব্বাস রা. এর সুদ বিলুপ্তির বর্ণনার পরে ইমাম সারাখসি রহ. বলেন, “এ বিধান দেয়া হয়েছে, কেননা ইবনে আব্বাস রা. ইসিলামগ্রহণ করার পরে মক্কায় ফিরে এসেছেন আর তিনি সুদি লেনদেন করতেন। তিনি তার কাজকর্মের কথা রাসুলুল্লাহ সা. থেকে গোপন রাখতেন না। এরপরও রাসুলুল্লাহ সা. যখন তাকে তা থেকে বারণ করেননি, এটাই প্রমাণ করে যে, তা বৈধ। এর মধ্য থেকে মক্কা বিজয়ের মুহূর্ত পর্যন্ত যা কবজা করা হয়নি রাসুলুল্লাহ সা. সেগুলোকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন। আমাদের অভিমতও এটাই। এই আয়াতের প্রেক্ষাপটও তাই—

وذَرُوا ما بَقيَ منَ الرِّبا

তোমরা বকেয়া সুদ ছেড়ে দাও। {সুরা বাকারাহ— ২৭৮} । {দেখুন— আলমাবসুত— ১৪/৫৭}

ইমাম আবু জাফর তহাবি রহ. বলেন, “আব্বাস রা. এর ইসলামগ্রহণ খায়বার বিজয়ের পূর্বেই হয়েছিলো, যেমনতা হাজ্জাজ ইবনে ইলাত সুলামির হাদিস (দেখুন— শরহু মুশকিলিল আসার— ৮/২৪২-২৪৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক— ৫/৪৬৬-৪৬৯; মুসনাদে আহমাদ— ৩/১৩৮-১৩৯; বায়হাকি— ৯/১৫১) প্রমাণ করে। সে সময়ে দারুল ইসলামে মুসলমানদের ওপর সুদ হারাম ছিলো। … এরপর বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ সা. বলেন—

ربا الجاهلية موضوع

“জাহেলি যুগের সুদ বিলুপ্ত”— আ বাক্যের মাঝেই প্রমাণ রয়েছে যে, মক্কা যেহেতু দারুল হারব ছিলো, তাই বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত সেখানে সুদ প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কেননা মক্কা থেকে জাহিলিয়্যাত দূর হয়েছে তার বিজয়ের দ্বারা। রাসুলুল্লাহ সা. এর ওই বাক্যটিতে প্রমাণ রয়েছে যে, আব্বাস রা. এর সুদও কায়িম ছিলো অনন্তর রাসুলুল্লাহ সা. তা বিলুপ্ত করেছেন। কেননা তা-ই শুধু বিলুপ্ত করা যায়, যা কায়িম থাকে। যা পূর্বেই রহিত হয়ে আছে, তা বিলুপ্ত করা যায় না। খায়বার বিজয় হয়েছে সপ্তম হিজরিতে। মক্কা বিজয় হয়েছে অষ্টম হিজরিতে। আর বিদায় হজ হয়েছে দশম হিজরিতে।

এতেই প্রমাণ রয়েছে যে, মক্কা ব্জয় পর্যন্ত আব্বাস রা. এর সুদি লেনদেন অব্যাহত ছিলো। অথচ তিনি তো মুসলিম আগেই হয়েছেন। এর মাঝে এই প্রমাণও রয়ে গেছে যে, মক্কা দারুল হারব হওয়ায় সেখানে মুসলমান এবং উশরিকদের মধ্যে সুদি লেনদেন হালাল ছিলো। অথচ তখন দারুল ইসলামে তা মুসলমানদের মাঝে হারাম ছিলো। {শরহু মুশকিলিল আসার, তাহাবি— ৮/৪৪২-৪৫২; মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা লিত তাহাবি, জাসসাস— ৩/৪৯২; আলমুকাদ্দিমাতুল মুমাহহিদাত— ২/৯-১০; আহকামুল কুরআন, জাসসাস— ১/৩৭১}

 

২য় দলিল—

মাকহুল রহ. রাসুলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণনা করেন—

لا ربا بين أهل الحرب

ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, আমার ধারণা, এরপরের শব্দটা এরূপ—

و أهل الإسلام

ইমাম সারাখসি রহ. এভাবে বর্ণনা করেছেন—

لا ربا بين المسلمين و بين أهل الحرب في دار الحرب

অর্থাৎ— দারুল হারবে মুসলমান এবং হারবিদের মাঝে কোনো সুদ নেই। {আররাদ্দু আলা সিয়ারিল আওযায়ি— ৯৭; কিতাবুল উম— ৭/৩২৬; মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, বায়হাকি— ১৩/২৭৬; নাসবুর রায়াহ— ৪/৪৪; তাকমিলাতুল মাজমু শরহুল মুহাযযাব, নববি— ১১/১৫৯; ফাতহুল কাদির— ৫/৩০০}

 

ইমাম সারাখসি রহ. বলেন, “এই হাদিসটি যদিও মুরসাল, তবে মাকহুল রহ. ফকিহ এবং সিকাহ। এমন ব্যক্তিত্ব থেকে মুরসাল গ্রহণীয়। দারুল হারবে হারবিদের কাছে দুই দিরহামের বিনিময়ে এক দিরহাম বিক্রি করার বৈধতার ব্যাপারে এটা ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর দলিল।” {আলমাবসুত, সারাখসি— ১৪/৫৬}

 

৩য় দলিল—

বনু কাইনুকার হাদিস। কেননা নবি সা. যখন তাদেরকে নির্বাসিত করেছেন, তখন তারা বললো, আমাদের কিছু ঋণ রয়েছে, যা পরিশোধের মেয়াদ এখনও আসেনি। তখন রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, নগদ দিয়ে দাও এবং (এর কারণে কিছু) কম দাও। বনু নাযির গোত্রকে নির্বাসন করার সময়ও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। {আসসিয়ারুল কাবির— ৪/১৪১২}

সারাখসি রহ. বলেন, এটা তো সুবিদিত যে, এ ধরনের লেনদেন মুসলমানদের মাঝে বৈধ নয়। কেননা যার যিম্মায় নির্দিষ্ট মেয়াদে অন্য কারো ঋণ থাকে, এরপর সে নগদ দেয়ার শর্তে তা কিছুটা কমিয়ে দেয়, তাহলে এটা বৈধ নয়। উমর, যায়দ বিন সাবিত এবং ইবনে উমর রা. তা অপছন্দ করেছেন। নবিজি সা. তাদের ব্যাপারে এটার বৈধতা দিয়েছেন, কেননা তারা সেই সময়ে হারবি ছিলো। এজন্য তাদেরকে নির্বাসিত করেছেন। তো আমরা জানতে পারলাম, মুসলমান এবং হারবির মাঝে এমন সব বিষয় বৈধ, যা মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে বৈধ নয়। {শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৪/১৪১২}

 

৪র্থ দলিল— কিয়াস

দারুল হারবে হারবিদের সম্পদ তো মৌলিকভাবে বৈধ। তা গ্রহণ করার অর্থ হলো অমালিকানাধীন মুবাহ সম্পদের কবজা নেয়া। ‘আমান’ গ্রহণের মাধ্যমে তা সংরক্ষিত সম্পদ হয়ে যায়নি। তবে ‘আমান’গ্রহণকারী মুসলিম দারুল হারবে পবেশের সময়ে অঙ্গীকার করে নিয়েছে যে, সে তাদেরকে ধোঁকা দিবে না, তাদের মনোতুষ্টি ছাড়া তাদের অর্থসম্পদ ভোগদখল করবে না। এখন তার জন্য এ বিষয়গুলো নিষিদ্ধ, যাতে সে ধোঁকাবাজ প্রতীয়মান না হয়। হারবি যখন স্বেচ্ছায় তার অর্থ প্রদান করলো, তখন নিষিদ্ধতার কারণ দূর হয়ে গেলো। মৌলিক বৈধতার কারণেই এক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা বৈধ হয়েছে, সুদ হালাল— এ বিবেচনায় নয়। {আলইনায়াহ— ৫/৩০০; আলবাহরুর রায়িক— ৬/১৪৭; তাবয়িনুল হাকায়িক— ৪/৯৭; বাদায়িউস সানায়ি’— ৯/৪৩৭৮; মাজমাউল আনহুর এবং আদদুররুল মুনতাকা— ২/৮৯-৯০}

ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মুহাম্মাদের বক্তব্যের কারণ বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে ইমাম সারাখসি রহ. বলেন, “তারা বলছেন, এ তো মনোতুষ্টির সাথে কাফিরের সম্পদ গ্রহণ। এর অর্থ— তাদের অর্থসম্পদ মৌলিক বৈধতার ওপরেই আছে। সে নিজেই অঙ্গীকার করে নিয়েছে যে, তাদের সাথে খেয়ানত করবে না। এ সকল উপায়ে সে তাদেরকে সন্তুষ্ট করে নিচ্ছে ধোঁকা-প্রতারণা থেকে দূরে থাকার জন্য। এরপর সে তাদের সম্পদ গ্রহণ করছে মৌলিক বৈধতার কারণেই, (নিষিদ্ধ) চুক্তির কারণে নয়। এর মাধ্যমেই হুকুম দারুল ইসলামে অবস্থানকারী আমানগ্রহণকারী কাফিরদের থেকে ভিন্ন হয়ে গেলো। কেননা ‘আমানে’র মাধ্যমে তাদের অর্থস্মপদ সংরক্ষিত হয়ে গেছে। বৈধতার বিচারে তা গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। {আলমাবসুত— ১০/৯৫; আলফুরুক,কারাবিসি— ১/৩২৬-৩২৭; মাজমাউল আনহুর— ২/৯০; ফাতাওয়া শামি— ৫/১৮৬}

 

এই হলো তাদের দলিলের প্রতি সংক্ষিপ্ত আলোকপাত। {আরো দেখুন— শরহুস সিয়ারিল কাবির— ৪/১৪৮৬; শরহু মুশকিলিল আসার, তাহাবি— ৮/২৪৮-২৪৯; মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা— ৩/৪৯১; তাবয়িনুল হাকায়িক— ৪/৯৭; ফাতহুল কাদির এবং আলইনায়াহ— ৫/৩০০; আলবাহরুর রায়িক— ৬/১৪৭; মাজমাউল আনহুর— ২/৯০; আলমুকাদ্দিমাতুল মুমাহহিদাত, ইবনে রুশদ— ২/৯-১০; আলমুবদি’ শরহুল মুকনি’— ৪/১৫৭; আলইনসাফ— ৫/৫৩; আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবি— ১/৫১৬; ইখতিলাফুল ফুকাহা, তাবারি— ৫৯}

 

জমহুরের অভিমত

 

 

অধিকাংশ ইমাম ও ফকিহ— আবু ইউসুফ, হাসান ইবনে যিয়াদ, শাফেয়ি, মালিক, আওযায়ি, লাইস ইবনে সা’দ, আবু সাওর, আহমদ ইবনে হাম্বলের এক বর্ণনা, ইসহাক এবং অন্যান্যদের অভিমত হলো, মুসলমানের জন্য দারুল হারবে হারবিদের থেকে সুদ গ্রহণ করা জায়িয নয়। {দেখুন— প্রাগুক্ত এবং আওরাদ্দু আলা সিয়ারিল আওযায়ি, ইমাম আবু ইউসুফ— ৯৬-৯৭; কিতাবুল আসল, সিয়ার অধ্যায়— ১৮০-১৮১; কিতাবুল উম, ইমাম শাফেয়ি— ৪/১৬২-১৬৫, ১৮১-১৮২, ৭/৩২৬; তাকমিলাতুল মাজমু’— ১১/১৫৮-১৫৯; রাওযাতুত তালিবিন— ৩/৩৯৫; আলমুগনি, ইবনে কুদামা— ৪/১৭৬-১৭৭, ১০/৫০৭; কাশশাফুল কিনা’— ৩/২৫৯; মাতালিবু উলিন নুহা— ৩/১৮৯; আলমুহাল্লা— ৮/৫১৪-৫১৫; আলফুরুক, কারাফি— ৩/২০৭; হাশিয়া ইবনুশ শাত আলাল ফুরুক— ২৩১; ইখতিলাফুল ফুকাহা, তাবারি— ৬০-৬৩; মা’রিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, বায়হাকি— ১৩/২৭৬}

 

জমহুরের দলিল

 

জমহুরের দলিল তো অসংখ্য। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করছি—

১. পবিত্র কোরআনের আয়াত এবং অগণিত সহিহ হাদিসে সুদ নিষিদ্ধতার ব্যাপকতা। এসব তো কোনো জায়গা বা কোনো কাওমের সাথে বিশেষিত নয়। সর্বদা সব জায়গায় প্রযোজ্য।

২. মুসলমান যেখানেই থাক, শরিয়তের বিধান মান্যকারী থাকবে। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা তার থেকে হক বিদূরিত করবে না, যেমন দারুশ শিরকে অবস্থান সত্ত্বেও তার থেকে নামাজের বিধান রহিত হয় না। আর ইসলামের বিধান হচ্ছে এ ধরনের কারবার-লেনদেন হারাম। যেমনিভাবে তা দারুল ইসলামে আমান নিয়ে বসবাসকারী হারবিদের সঙ্গে বৈধ নয়, তেমনি দারুল হারবের হারবিদের সঙ্গেও তা বৈধ হবে না।

৩. দারুল ইসলামে যা কিছু হারাম, তার সবই দারুল হারবেও হারাম। যেমন— মদপান, ব্যভিচার থেকে শুরু করে সকল অশ্লীলতা, পাপাচার ও গুনাহ।

৪. সুদ যেমনিভাবে মুসলমানদের জন্য হারাম, তেমনি কাফিরদের জন্যও হারাম। কেননা শরিয়তের নিষিদ্ধ এবং হারাম বিধিবিধানের মুখাতাব তারাও। কোরআনের নস দ্বারা কাফিরদের জন্যও সুদ হারাম করা হয়েছে। {এ বিষয়টা বিস্তারিত জানতে দেখুন— উসুলুস সারাখসি— ১/৭২-৭৮; তাইসিরুত তাহরির— ২/১৪৮-১৫০; আততালওয়িহ আলাত তাওযিহ— ১/২১৩-২১৫; তাফসিরে কুরতুবি— ৬/১২, ৪/১৪৬; কাশফুল আসরার— ৪/২৪৩-২৪৫; আলবুরহান, ইমামুল হারামাইন জুওয়াইনি— ১/১০৭-১১০; শরহু তানকিহিল ফুসুল, কারাফি— ১৬৬-১৬৭; আলফুরুক— ১/২১৮; নিহায়াতুস সুল— ১/৩৬৯-৩৮৩; শরহুল কাওকাবিল মুনির— ১/৫০০-৫০৫; তাখরিজুল ফুরু’ আলাল উসুল, যানজানি— ৯৮-১০০; আততামহিদ, ইসনাওয়ি— ১২৬-১৩২; আলকাওয়ায়িদ ওয়াল ফাওয়ায়িদ আলউসুলিয়্যাহ, ইবনুল লাহহাম— ৪৯-৫৭; আলমানসুর ফিল কায়ায়িদ, যারকাশি— ৩/৯৭-১০১; শরহুল মানহাজিল মুনতাখাব ইলা কাওয়ায়িদিল মাযহাব, ইমাম আহমাদ ইবনে আলী মানজুর— ২৬১-২৬৬; উসুলুল ফিকহ, শায়খ আবুন নুর যুহায়র— ১/১৮৪-১৯১}

৫. এই কারবারে গৃহীত সম্পদ ফাসিদ চুক্তির মাধ্যমে গৃহীত সম্পদ। আর ফাসিদ চুক্তি মালিকানার ফায়দা দেয় না।

৬. দারুল হারব দারুল বাগয়ি (বিদ্রোহের শহর) এর মতো, তার ওপর আদিল ইমাম (মুসলমানদের ন্যায়নিষ্ঠ শাসক) এর কোনো কতৃত্ব নেই। আর সর্বসম্মতিক্রমে দারুল বাগয়িতে সুদের লেনদেন বৈধ নয়। তেমনি দারুল হারবেও তা বৈধ হবে না।

 

জমহুরের পক্ষ থেকে ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মুহাম্মাদের দলিলসমূহের খণ্ডন

 

১. দারুল হারবে সুদের লেনদেনের বৈধতার পক্ষে আব্বাস রা. এর ঘটনা দ্বারা দলিল পেশ করা অনেক কারণেই যুক্তিযুক্ত নয়। মৌলিক কারণ দুটো।

ক. আব্বাস রা. এর যিম্মায় সুদ ছিলো জাহেলি যুগে, তার ইসলামগ্রহণের পূর্বে। হাদিসের শব্দকে এ অর্থে গ্রহণ করাই যথেষ্ট। তিনি ইসলামগ্রহণের পরও সুদি লেনদেন অব্যাহত রেখেছেন— এমন কোনোই দলিল নেই। আর যদি মেনেও নেয়া হয় যে, ইসলামগ্রহণের পরও তিনি সুদি কায়কারবার করেছেন, তাহলে হতে পারে যে, তিনি তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে অবগত ছিলেন না। তাই নবিজি সা. এই মূলনীতি সেদিন থেকে এই মূলনীতি স্থির করতে চেয়েছেন।

খ. আব্বাস রা. সাধারণভাবেই মুশরিকদের থেকে সুদ নিতেন। তা এজন্য করতেন না যে, দারুল ইসলামে সুদের লেনদেন অবৈধ হলেও দারুল হারবে তা বৈধ। বরং এজন্য যে, তখনও সুদ চূড়ান্তভাবে হারাম হয়নি। সুদের নিষিদ্ধতা কয়েক ধাপে অবতীর্ণ হয়েছে এবং তা পূর্ণতা লাভ করেছে এই আয়াতের মাধ্যমে—

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

হে ইমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং বকেয়া সুদ ছেড়ে দাও। যদি মুমিন হয়ে থাকো, তবে তা করো। {সুরা বাকারাহ— ২৭৮}

এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে সাকিফ গোত্রের ইসলামগ্রহণ এবং সন্ধির পর, যা হিজরি নবম বর্ষে সংঘটিত হয়েছে; অর্থাৎ, বিদায় হজের কিছু আগের ঘটনা।  এর আগে সুদের নিষিদ্ধতা অকাট্য এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত ছিলো না। এজন্য আব্বাস রা. মক্কায় মুশরিকদের সাথে সুদি লেনদেন করতেন এবং তাদের থেকে সুদ নিতেন। নবম হিজরিতে অবতীর্ণ সেই আয়াতকেই বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ সা. আরো তাকিদ করেছেন তার সেই ঐতিহাসিক বক্তব্যের দ্বারা।

 

২. মাকহুল রহ. থেকে বর্ণিত হাদিসটি প্রমাণিত নয়। এমনকি অনেক হানাফি আলিমও মন্তব্য করেছেন, এটা একটি মাজহুল (অজ্ঞাত) বর্ণনা, যা কোনো সহিহ, মুসনাদ কিবা নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবে বর্ণিত হয়নি। তাছাড়া এটি একটি মুরসাল বর্ণনা, যা হাদিস হওয়ার সম্ভাবনা রাখে মাত্র। এই সম্ভাবনাপূর্ণ একটি বর্ণনা সুদের নিষিদ্ধতার ব্যাপারে অকাট্য সব দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না।

আর যদি এই মুরসাল বর্ণনার প্রামাণ্যতা মেনেও নেয়া হয়, তবুও হানাফিদের উসুলেই তা টিকে না। কেননা হানাফিদের উসুল হলো, খবরে ওয়াহিদের মাধ্যমে কিতাবুল্লাহর ওপর যিয়াদাহ করা জায়িয নেই। কেননা তখন এটা নসখ বলে ধর্তব্য হয়। আর খবরে ওয়াহিদ কিতাবুল্লাহ নসখ করার যোগ্যতা রাখে না।

তাছাড়া “লা রিবা” বলার দ্বারা “নাহি”ও উদ্দেশ্য হতে পারে। যেমন এই আয়ানে “নাফি” দ্বারা “নাহি” উদ্দেশ্য—

فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ

আর দলিলের মাঝে একাধিক সম্ভাবনা চলে আসলে তা দলিল হিসেবে উল্লেখ করার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।

 

৩. তাদের কিয়াসও এক্ষেত্রে দলিল হিসেবে টিকে না। কেননা গনিমতের মাধ্যমে তাদের অর্থসম্পদ বৈধ হওয়া তো এটা অপরিহার্য করে না যে, ফাসিদ চুক্তির মাধ্যমেও তা বৈধ হবে। এজন্যই তো হারবি নারীদেরকে বন্দি করার মাধ্যমে তারা হালাল হয়ে যায়, কিন্তু তাই বলে ফাসিদ চুক্তির মাধ্যমে তা তো বৈধ হয় না। সুদ ইসলামে নিষিদ্ধ একটি চুক্তি। সুতরাং এর দ্বারা মালিকানা লাভ হতে পারে না। তাই এটা অবৈধ পন্থায় সম্পদ আত্মসাৎ হিসেবে ধর্তব্য হবে, পবিত্র কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে যা সুস্পষ্ট ও অকাট্য হারাম।

 

৪. বনু নাযিরের ঘটনাকেও দলিল হিসেবে উল্লেখ করা সঙ্গত নয়। কেননা এই বর্ণনাটি এতোই দুর্বল, যা প্রমাণস্বরূপ উল্লেখ করার যোগ্য নয়। তাছাড়া এই দলিলে আরো একাধিক সমস্যার দিক রয়েছে। বিস্তারিত জানতে শাইখুল ইসলাম তাকি উসমানি দা. বা. প্রণীত “বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যা মুআসিরাহ” দ্রষ্টব্য।

 

জমহুরের দলিল এবং ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মাদের দলিলের পর্যালোচনা সম্পর্কে জানতে ওপরের সূত্রগুলো দ্রষ্টব্য।

 

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে দারুল হারবে হারবিদের থেকে সুদ গ্রহণের মাসআলায় জমহুরের মাযহাব যে শক্তিশালী তা প্রমাণিত হলো। তাছাড়া অনেক হানাফি ফকিহও এই অভিমতই পোষণ করেছেন। যেমন ওপরে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর কথা বর্ণিত হয়েছে। বিদগ্ধ হানাফি মুফতিরাও এর আলোকেই ফতোয়া দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। দু-চারজন ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মাদের মতকে অবলম্বন করেছেন। এর ভিত্তিতেই মুফতি খালিদ সাইফুল্লাহ রহমানি দা. বা. ভারতে কাফিরদের থেকে সুদ নেয়া বৈধ, যেহেতু ভারত দারুল হারব— মর্মে ফতোয়া দিয়েছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ মুফতিগণ তার এই ফতোয়া গ্রহণ করেননি।

  

 

Share This