বই পর্যালোচনা : অমুসলিমদের সাথে যেমন ছিলেন রাসুল ﷺ (১ম পর্ব)

লেখক : ড. রাগিব সিরজানি

অনুবাদক : মাওলানা সাইফুল ইসলাম

সম্পাদক : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

প্রকাশনী : পথিক প্রকাশন

প্রকাশক : মুহাম্মাদ ইসমাইল হুসাইন

পরিবেশক : আর-রিহাব পাবলিকেশন্স

বইটি যেভাবে সাজানো হয়েছে :

১. সম্পাদকীয় কলাম

২. অনুবাদকের কথা

৩. লেখকের ভূমিকা

৪. প্রথম অধ্যায় : ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ

৫. দ্বিতীয় অধ্যায় : অমুসলিমদের স্বীকৃতি

৬. তৃতীয় অধ্যায় : অমুসলিমদের প্রতি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সম্মান প্রদর্শন

৭. চতুর্থ অধ্যায় : অমুসলিমদের সাথে ন্যায়পরায়ণতা

৮. পঞ্চম অধ্যায় : অমুসলিমদের সাথে সদাচারণ

৯. ষষ্ঠ অধ্যায় : রাসুলুল্লাহ ﷺ ও বিরোধী নেতাদের সাথে তাঁর সদাচরণ

১০. পরিশিষ্ট (লেখক এতে তিনটি আবেদন জানিয়েছেন)

১১. লেখক পরিচিতি

প্রথমেই বলে রাখছি, আমাদের এ পর্যালোচনার উপস্থাপনা হবে সমালোচনাধর্মী। আমরা ধারাবাহিকভাবে একাধিক পর্বে এ বইয়ের সমস্যার দিকগুলো শুধু চিহ্নিত করব। ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে অনেক ভাই-ই ইতিমধ্যে লিখেছেন ও সামনেও লেখবেন। তাই সে দিকগুলো আমরা আর এ পর্যালোচনায় আনব না। দুধের সঙ্গে সামান্য পরিমাণ প্রস্রাব মিশ্রিত হলেও সেই দুধ আর খাওয়ার উপযোগী থাকে না। হ্যাঁ, প্রস্রাব মিশ্রিত না হয়ে কোনো পবিত্র পদার্থ মিশ্রিত হলে ভিন্ন কথা। তাই কোনো বইয়ের কন্টেন্টে মৌলিক সমস্যা থাকলে আমরা সাধারণ পাঠকদের জন্য শুধু সেগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করি; যাতে বই পাঠ করার সময় পাঠক এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে সচেতনতার সঙ্গে এগোন। আমরা আমাদের পর্যালোচনায় বানানরীতির ভুলগুলো চিহ্নিত করব না। তবে এতটুকু বলে রাখা প্রয়োজন, যিনি প্রুফ সমন্বয় করেছেন, তার যোগ্যতা এখনো পর্যাপ্ত হয়ে ওঠেনি—বই দেখে এমনটাই মনে হয়েছে।

অনুবাদক এবং প্রকাশকের সম্মতিক্রমেই এ পর্যালোচনায় হাত দেওয়া। আর দালিলিকভাবে যেকোনো বই সম্পর্কে আলোচনা হওয়াই দোষের কিছু নয়। হ্যাঁ, এতে কোনো ধরনের জুলুম হলে তা হবে দোষণীয়। যাহোক, এবার আমরা মূল আলোচনায় ফিরি। আজকের পর্যালোচনায় আমরা বইয়ের ভূমিকার দুয়েকটি বিষয়ের ওপরই আলোকপাত করব। পরবর্তী পর্বগুলোতে ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য অধ্যায়গুলো সম্পর্কেও আলোচনা আসবে ইনশাআল্লাহ। উল্লেখ্য, এক পর্যালোচনায় পুরো বইকে কোট করা সম্ভব নয়। তাই কারও যদি কোনো ব্যাপারে খটকা লাগে, তাহলে মূল বই খুলে মিলিয়ে নেওয়ার অনুরোধ থাকল। এখানে শুধু ততটুকুই কোট করা হবে, আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য যতটুকু না হলেই নয়। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, পর্যালোচনার শেষ পর্বে আমরা পুরো বই সম্পর্কে পয়েন্ট আকারে সামগ্রিক মূল্যায়ন উপস্থাপন করব।

ভূমিকা থেকে দুটো পয়েন্ট :

১. ‘অস্ত্র ও তরবারির জোরে নয়; বরং দলিল-প্রমাণ ও আপন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ইসলাম চিরবিজয়ী দীন। ইসলামের সঠিক দাওয়াত ও নবী চরিত্রের বাস্তবিক বিবরণ তুলে ধরতে পারলেই মানুষের হিদায়াতের জন্য অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই। দলে দলে লোক ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের জন্য শুধুমাত্র ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়াই যথেষ্ট।’ (পৃ. ১৭-১৮)

লেখক তার এ দাবির পক্ষে পবিত্র কুরআনের তিনটি আয়াত (সুরা নাহল : ৩৫, সুরা নুর : ৫৪; সুরা মায়িদা : ৯২) উল্লেখ করেন। এরপর তিনি লেখেন, ‘পবিত্র কুরআনে এ ধরনের অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যার সবগুলো উল্লেখ করা দুরূহ ব্যাপার।

২. ‘এ গ্রন্থে শুধু ওইসব অমুসলিমদের সাথে রাসুলের আচরণ প্রসঙ্গ উল্লেখ হয়েছে, যারা ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ নিরাপত্তাপ্রাপ্ত যিম্মী অমুসলিম বা যুদ্ধরত নয় এমন স্বাভাবিক অবস্থানে থাকা অমুসলিম। আর যারা দারুল হারবে ইসলামের বিরুদ্ধে সদা তৎপর কট্টরপন্থী অমুসলিম, পবিত্র কুরআনে যাদেরকে আমাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সে সকল শত্রু কিংবা কয়েদি অমুসলিমদের সাথে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আচরণ প্রসঙ্গে আলোচনার জন্য এ গ্রন্থ নয়।’ (পৃ. ২২)

উপরিউক্ত পয়েন্ট তিনটির পর্যালোচনা :

১. লেখক দাবি করেছেন, ‘অস্ত্র ও তরবারির জোরে নয়; বরং দলিল-প্রমাণ ও আপন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ইসলাম চিরবিজয়ী দীন।’

এবার আমরা দেখি, এ ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহ কী বলে।

আল্লাহ বলেন :

يُرِيدُونَ أَنْ يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَنْ يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ (32) هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ (33)

তারা আল্লাহর নুরকে তাদের মুখের ফুঁ দ্বারা নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ তার নুরের পূর্ণ উদ্ভাসন ছাড়া আর কিছুতেই সম্মত নয়; কাফিররা এটাকে যতই অপ্রীতিকর মনে করুক না কেন। তিনি সেই সত্তা, যিনি তার রাসুলকে পাঠিয়েছেন হিদায়াত ও সত্য দীনসহ; যাতে তিনি অন্য সব দীনের ওপর তাকে বিজয়ী করেন; মুশরিকরা এটাকে যতই অপ্রীতিকর মনে করুক না কেন। (সুরা তাওবা : ৩২-৩৩)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনু কাসির রহ. নিচের হাদিসগুলো উদ্ধৃত করেছেন :

إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِيَ الْأَرْضَ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا، وَسَيَبْلُغُ مُلْكُ أُمَّتِي مَا زُوي لِي مِنْهَا

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার জন্য পৃথিবীকে—তার পূর্ব ও পশ্চিম সীমানাকে সংকুচিত করে দিয়েছেন। আর শিঘ্রই আমার উম্মাহর রাজত্ব ততটুকু পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে, পৃথিবীর যতটুকু আমার জন্য সংকুচিত করা হয়েছিল।’ (সহিহ মুসলিম : ২৮৮৯; সুনানু আবি দাউদ : ৪২৫২)

عَنْ تَمِيمٍ الدَّارِيِّ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: “لَيَبْلُغَنَّ هَذَا الأمرُ مَا بَلَغَ الليلُ وَالنَّهَارُ، وَلَا يَتْرُكُ اللَّهُ بَيْتَ مَدَر وَلَا وَبَر إِلَّا أَدْخَلَهُ هَذَا الدِّينَ، بعِزِّ عَزِيزٍ، أَوْ بِذُلِّ ذَلِيلٍ، عِزًّا يُعِزُّ اللَّهُ بِهِ الْإِسْلَامَ، وَذُلًّا يُذِلُّ اللَّهُ بِهِ الْكُفْرَ”، فَكَانَ تَمِيمٌ الدَّارِيُّ يَقُولُ: قَدْ عَرَفْتُ ذَلِكَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، لَقَدْ أَصَابَ مَنْ أَسْلَمَ مِنْهُمُ الخيرَ والشرفَ والعزَّ، وَلَقَدْ أَصَابَ مَنْ كَانَ مِنْهُمْ كَافِرًا الذُّلَّ وَالصَّغَارَ وَالْجِزْيَةَ

তামিম দারি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি, এই দীন সেই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যেখানে রাত-দিন পৌঁছেছে। আল্লাহর শহর-গ্রামের এমন কোনো ঘর রাখবেন না, যেখানে এই দীনকে প্রবেশ করাবেন না—সম্মানী ব্যক্তির সম্মানের সঙ্গে এবং লাঞ্ছিত ব্যক্তির লাঞ্ছনার সঙ্গে; এমন সম্মান, যার মাধ্যমে আল্লাহ ইসলামকে সম্মানিত করবেন এবং এমন লাঞ্ছনা, যার মাধ্যমে আল্লাহ কুফরকে লাঞ্ছিত করবেন।’ তামিম দারি রা. বলতেন, ‘আমি আমার ঘরের মানুষদের মধ্যে এর যথার্থতা জেনেছি। তাদের মধ্য থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা কল্যাণ, মর্যাদা এবং সম্মান লাভ করেছে। আর তাদের মধ্যে যারা কাফিররূপে থেকেছে, তারা লাঞ্ছনা, হীনতা ও জিযয়ার শিকার হয়েছে।’ (মুসনাদু আহমাদ : ১৬৯৫৭। হাইসামি রহ. বলেন, আহমাদ রহ.-এর বর্ণনার বর্ণনাকারীগণ সহিহ গ্রন্থের বর্ণনাকারীবৃন্দই।)

অন্য বর্ণনায় হাদিসটি এভাবে এসেছে :

إِمَّا يُعِزُّهُمُ اللَّهُ فَيَجْعَلُهُمْ مِنْ أهلها، وإما يذلهم فيدينون لها

হয়তো আল্লাহ তাদের সম্মানিত করবেন। ফলে তিনি তাদের ইসলামগ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত বানাবেন। অথবা তিনি তাদের লাঞ্ছিত করবেন। ফলে তারা ইসলামের সামনে অবনত হবে। (মুসনাদু আহমাদ : ২৩৮১৪)

আবদুল কায়স গোত্রের প্রতিনিধিদল যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আগমন করেন, তখন তিনি তাদের বলেন :

مَرْحَبًا بِالْقَوْمِ غَيْرَ خَزَايَا وَلَا نَدَامَى

‘স্বাগতম সে প্রতিনিধিদলের প্রতি, যারা অপদস্থ ও লজ্জিত না হয়েই আগমন করেছে।’ (সহিহ বুখারি : ৫৩)

কুরআন মাজিদে আল্লাহ বলেন :

قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ

কিতাবিদের মধ্যে যারা ইমান রাখে না আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি এবং আল্লাহ ও তার রাসুল যা কিছু হারাম করেছেন, সেগুলোকে হারাম মনে করে না এবং সত্য দীনকে নিজের দীন বলে স্বীকার করে না, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো; যাবত্‌ না তারা হেয় হয়ে নিজ হাতে জিযয়া আদায় করে। (সুরা তাওবা : ২৯)

এ ছাড়াও তিনি বলেন :

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ

তোমরা কাফিরদের সঙ্গে লড়াই করো, যাবত্‌ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। (সুরা আনফাল : ৩৯)

আর প্রকাশ থাকে যে, কুফরের চাইতে বড় কোনো ফিতনা হতে পারে না। ইমাম কুরতুবি তাঁর তাফসিরগ্রন্থে এই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে বলেন, ‘ফিতনা : অর্থাৎ কুফর।’

ইসলাম যে দলিল-প্রমাণ ও আপন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে চিরবিজয়ী দীন—এ কথা তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এতে আমাদের কোনো মতবিরোধ নেই। আর না এতে মতবিরোধ করার কোনো সুযোগ আছে। কিন্তু লেখক যে ইসলামকে অস্ত্র ও তরবারির জোরে বিজয়ী নয় বলে অভিহিত করতে চাইলেন, এ তো তথাকথিত শান্তিকামীদের মতো কথা হলো। নিঃসন্দেহে ইসলাম তরবারির মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছে; যেমনি তা আদর্শের মাধ্যমেও বিজয়ী হয়েছে। মদিনা বিজয় হয়েছে আদর্শের মাধ্যমে, আর মক্কা থেকে শুরু করে তৎকালীন সুপার পাওয়ার রোম-পারস্য সবই বিজিত হয়েছে তরবারির মাধ্যমে। ইসলাম অমুসলিমদের ব্যক্তিজীবনে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেনি ঠিক; কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিসরে ইসলামের সামনে কর প্রদানপূর্বক আত্মসমর্পণ করার জন্য ইসলাম অবশ্যই তাদের বাধ্য করেছে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত তারা এটা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই চলার স্পষ্ট ঘোষণাও জানিয়ে দিয়েছে।

যারা ইসলামের বিজয়ের পেছনে তরবারির কোনো ভূমিকা দেখেন না, তারা ইতিহাসের প্রোজ্জ্বল পাঠ থেকে কীভাবে নিজেদের দৃষ্টি সরিয়ে রাখেন, তা আমার বোধগম্য হয় না।

২. লেখকের দাবি : ‘এ গ্রন্থে শুধু ওইসব অমুসলিমদের সাথে রাসুলের আচরণ প্রসঙ্গ উল্লেখ হয়েছে, যারা ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ নিরাপত্তাপ্রাপ্ত যিম্মী অমুসলিম বা যুদ্ধরত নয় এমন স্বাভাবিক অবস্থানে থাকা অমুসলিম। আর যারা দারুল হারবে ইসলামের বিরুদ্ধে সদা তৎপর কট্টরপন্থী অমুসলিম, পবিত্র কুরআনে যাদেরকে আমাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সে সকল শত্রু কিংবা কয়েদি অমুসলিমদের সাথে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আচরণ প্রসঙ্গে আলোচনার জন্য এ গ্রন্থ নয়।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী কুরআনে মুসলমানদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে শুধু সে সকল অমুসলিমকে, যারা ‘দারুল হারবে’ অবস্থানকারী, ‘ইসলামের বিরুদ্ধে সদা তৎপর’ এবং ‘কট্টরপন্থী অমুসলিম’। আর যুদ্ধরত নয় এমন স্বাভাবিক অবস্থানে থাকা অমুসলিমদের কুরআনে মুসলমানদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

অথচ কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহিনের অগণিত বক্তব্যের আলোকে সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত, মুসলমানদের জন্য সকল কাফির-মুশরিকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা অপরিহার্য। সুরা মুমতাহিনা : ১, ৪; সুরা মায়িদা : ৫১, ৮০-৮২, ৫৭ সুরা তাওবা : ২৩, সুরা মুজাদালা : ২২, সুরা আলে ইমরান : ১১৮-১২০

শাইখ বিন বাজ রহ. বলেন :

ان جميع الكفار كلهم أعداء للمؤمنين بالله سبحانه وبرسوله محمد ﷺ، ولكن اليهود والمشركين عباد الأوثان أشدهم عداوة للمؤمنين، وفي ذلك إغراء من الله سبحانه للمؤمنين على معاداة الكفار والمشركين عموما وعلى تخصيص اليهود والمشركين بمزيد من العداوة في مقابل شدة عداوتهم لنا

নিশ্চয়ই সকল কাফির আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি ইমান আনয়নকারী (মুসলিম)-দের শত্রু। তবে মুমিনদের প্রতি ইহুদি, মুশরিক এবং অগ্নিপূজকরা সর্বাধিক শত্রুতা পোষণকারী। আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনদের উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে সকল কাফির এবং মুশরিকের প্রতি ব্যাপকভাবে এবং ইহুদি ও মুশরিকগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষভাবে অধিক শত্রুতা পোষণ করার ব্যাপারে; যেহেতু তারা আমাদের প্রতি তাদের শত্রুতা প্রচণ্ড। লিংক : https://goo.gl/ztStts  

এ ছাড়াও আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা সংক্রান্ত গ্রন্থাদিতে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সকল কাফির এবং মুশরিকই মুসলমানদের শত্রু। যারা আল্লাহর অস্তিত্ব বা তার উপাস্য হওয়ার গুণের প্রতিই বিশ্বাস স্থাপন করে না, তারা কীভাবে কোনো মুসলমানের বন্ধু হতে পারে! একজন মুসলমান কীভাবে শিরক এবং কুফরকে প্রশ্রয় দিতে পারে বা মেনে নিতে পারে! হ্যাঁ, তারা যখন চুক্তিবদ্ধ হয়, তখন তাদের প্রতি বিদ্বেষ থাকা সত্ত্বেও বিশেষ স্বার্থে তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। আর যখন তারা চুক্তিহীন হয়, তখন সেই সৌজন্যমূলক আচরণ প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই।

এটা এমনই এক সুস্পষ্ট বিষয়, যাতে সংশয়ে আক্রান্ত হওয়ার কোনো কারণই নেই। কারণ, যে সকল কাফির-মুশরিক মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ নয়, পরিভাষায় তাদের বলা হয় হারবি। হাম্বলি ফকিহগণ বলেন, ‘হারবি শব্দটা হারবের দিকে সম্পর্কিত। হারব অর্থ : কিতাল (লড়াই)। তেমনি এর অর্থ দূরত্ব এবং বিদ্বেষও। তো দারুল হারব অর্থ হলো এমন রাষ্ট্র, যার সঙ্গে মুসলমানদের দূরত্ব কিংবা মুসলমানদের প্রতি রয়েছে যার বিদ্বেষ। হারবিকে হারবি এই দ্বিতীয় অর্থ—তথা দূরত্ব এবং বিদ্বেষ-এর বিচারেই বলা হয়। কার্যত যুদ্ধে লিপ্ত থাকা জরুরি নয়। (আলমুতলি আলা আবওয়াবিল মুকনি, বা‘লি : ২২৬)

অনেকের ধারণা, হারবি তাকেই বলে, যে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। শব্দ থেকেও অনেকটা এ সংশয় হয়। তবে ফকিহগণের পরিভাষায় হারবি তিন শ্রেণি :

১. যারা বাস্তবে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে যারা পৃথিবী থেকে বিতাড়িত করার প্রয়াসে সর্বদা তৎপর।

২. যারা বিভিন্নভাবে মুসলমানদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে রেখেছে। তাদেরকে হয়রানি করে। জান-মাল-সম্ভ্রম লুট করে। অর্থনৈতিকভাবে মুসলমানদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাখে। কিংবা মুসলমানদেরকে তাদের দীন থেকে ফেরানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত। অথবা যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত—তাদেরকে সহযোগিতা প্রদান করে।

৩. যারা মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধেও লিপ্ত নয়, যারা যুদ্ধে লিপ্ত তাদেরও সহযোগী নয়; কিন্তু মুসলমানদের সঙ্গে তাদের কোনোপ্রকার চুক্তি নেই।

উপরিউক্ত তিনও শ্রেণিই ফকিহগণের পরিভাষায় হারবি। হারবি হওয়ার জন্য হারবে (যুদ্ধে) লিপ্ত থাকা আবশ্যক নয়। (বাদায়িউস সানায়ি : ৯/৪৩৭৫; আল-মিসবাহুল মুনির : ১/১২৭; আদ-দুররুন নাকি ফি শরহি আলফাযিল খিরাকি, ইবনু আবদিল হাদি : ৩/৭৪৪; আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ ফিল আজওয়িবাতিন নাজদিয়্যাহ : ৭/৩৯৭; আল-ইসতিআনা বি গাইরিল মুসলিমিন : ১৩২; উসুলুল আলাকাতিদ দুওয়ালিয়্যাহ : ৩১৩)

তো যেখানে তাদের নামকরণই করা হচ্ছে হারবি; যার অর্থের মধ্যেই শত্রুতা ও দূরত্বের কথা নিহিত রয়েছে, সেখানে শুধু তাদের বিশেষ প্রকার, অর্থাৎ যারা সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত বা ‘দারুল হারবে’ অবস্থানকারী, ‘ইসলামের বিরুদ্ধে সদা তৎপর’ এবং ‘কট্টরপন্থী অমুসলিম’ সঙ্গে বিশেষিত করা তো তথাকথিত শান্তিকামীদের বুলি সদৃশ মতামত বৈ কিছু নয়।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

বই পর্যালোচনা : অমুসলিমদের সাথে যেমন ছিলেন রাসুল ﷺ (২য় পর্ব)

১ম পর্বের লিংক : https://goo.gl/XZYrYq

আজ আমরা বইয়ের ‘প্রথম অধ্যায় : ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ’ সম্পর্কে পর্যালোচনা করব। পর্যালোচনাটি পড়ার আগে কিছু বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন। পর্যালোচনার ১ম পর্বে আমরা সেগুলোর ওপর আলোকপাত করেছি। অনুগ্রহপূর্বক দেখে নেবেন।

এই অধ্যায়ে লেখক কয়েকটি দাবি তুলতে চেয়েছেন :

১. ড. সিরজানি লিখেছেন, ‘নিশ্চয় একজন মানুষ সাধারণ মানবিক বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত এবং সাধারণত এ সম্মানের বিষয়টি সকল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে এতে কোনো তারতম্য নেই। আল্লাহ তাআলা স্বীয় গ্রন্থে ঘোষণা করেন :

‘আর আমরা অবশ্যই আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সাগরে তাদেরকে চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে উত্তম রিজিক দান করেছি আর আমরা যাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ [সুরা ইসরা : ৭০]…

ইসলামের এ দৃষ্টিভঙ্গিটি সকল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। ইসলামি শরিয়াতে সকল ক্ষেত্রেই মানবকুলের প্রতি এ মর্যাদা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সকল কথা এবং কাজেই এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। এটা আমাদের জন্য এক মহান ও অনন্য পন্থা এবং পদ্ধতির সন্ধান দেয়, যে পন্থা ও পদ্ধতিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ স্বীয় বিরুদ্ধাচারণকারী ও অস্বীকারকারীদের সাথে আচরণ করেছেন। সকলের সাথেই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আচরণ ছিল সম্মানসূচক।’ (পৃ. ২৩)

 ২. কোনো মানুষকে অন্যায়ভাবে অপদস্থ করা বা কারও প্রতি জুলুম করা কিংবা স্বীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং তার মর্যাদাহানি করা বৈধ নয়। এ বিষয়টি কুরআনুল কারিমের অনেক আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনচরিত থেকে স্পষ্টত ফুটে ওঠে। আল্লাহ তাআলা বলেন :

‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করবে না।’ [সুরা আনআম : ১৫১]

কুরআন কারিমের এ আদেশটি ব্যাপক অর্থবোধক। কাজেই মুসলিম এবং অমুসলিম সকল মানবপ্রাণই এখানে উদ্দেশ্য। অতএব, ইসলামের আদল তথা ইনসাফ ও ন্যায়ের বাস্তবায়নও সাধারণভাবে সকলের জন্যই সমহারে প্রযোজ্য হবে। ধর্ম ও বর্ণ বিবেচনায় এখানে তারতম্য করা যাবে না।’ (পৃ. ২৪)

৩. এক ইহুদির জানাযা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি দাঁড়িয়েছিলেন (সহিহ বুখারি : ১৩১২)—এ ঘটনাটি উল্লেখ করার পর লেখক বলেন, ‘নবি ﷺ প্রদর্শিত এ পন্থা বা অবস্থানটি কি শ্রেষ্ঠতর নয়? এটাই হচ্ছে একজন মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ ﷺ উপরিউক্ত অবস্থান এবং আচরণবিধির মাধ্যমে সকল শ্রেণির মানুষের জন্য মুসলিমদের হৃদযন্ত্রে আত্ম-উপলব্ধি এবং সম্মানের বীজ বপন করেছেন। আর এরূপ সম্মানসূচক আচরণ তিনি সাধারণভাবেই করেছেন; ওই ইহুদির আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে করেছেন এবং অন্যদের এরূপ করার আদেশ দিয়েছেন—এ কথা জানার পরও যে, ওই লোকটি একজন ইহুদি ছিল।…

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এ সম্মানসূচক দাঁড়ানো সামান্যতম সময়ের জন্য ছিল না; বরং শবদেহটি অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছিল।… নিঃসন্দেহে এ অবস্থানটি সাহাবায়ে কেরাম, অনুরূপভাবে তৎপরবর্তী মুসলিমদের হৃদয়েও এ সুদৃঢ় চেতনা জাগ্রত করেছে যে, ইসলাম একজন মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে তার যথাযোগ্য মর্যাদা দেয় এবং সম্মানের চোখে দেখে। (পৃ. ২৬-২৮)

৪. তা ছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব নির্ধারিত বিষয় রয়েছে, যা আকিদা-বিশ্বাসী মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধাচারণকারী ও তাদের থেকে ভিন্নমত পোষণকারীদের ব্যাপারে মুসলিমদের চিন্তা-চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে—তা হচ্ছে, তারা মনে করে যে, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক, সম্ভাব্য বরং অনিবার্য বিষয়। কেননা (পরবর্তীকালে) কখনো এমন কোনো কাল আসেনি, যখন কোনো একটি ইস্যুতে সকল আলিম ঐকমত্য পোষণ করতেন। এমনকি উলুহিয়্যাত ও তাওহিদের মতো ইস্যুতেও। আল্লাহ তাআলা বলেন,

‘আর আপনার রব ইচ্ছা করলে সকল মানুষকে এক জাতি পরিণত করতে পারতেন; কিন্তু তারা পরস্পর মতবিরোধকারীই রয়ে গেছে।’ (সুরা হুদ : ১১৮)

কাজেই মুসলিমগণ এ কথা খুব সহজেই মেনে নে যে, আকিদাগত দিক থেকে ভিন্ন মতাবলম্বী থাকতেই পারে এবং তারা এ কথাও জানে যে, এদেরকে একেবারে দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত করাও অসম্ভব। এ জন্যই মুসলিমগণ বিরুদ্ধবাদীদের সাথে স্বাভাবিকভাবেই সহাবস্থান মেনে নেয় এবং এ জন্যই ইসলামি শরিয়াত অমুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে সর্বোত্তম, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুস্পষ্ট আচরণ পরিকাঠামো প্রদর্শন করে। (পৃ. ২৯)

৫. বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, অমুসলিমদের দীর্ঘকাল ধরে আল্লাহর রাস্তা থেকে বিমুখ হয়ে থাকা এবং দীন ইসলাম নিয়ে তাদের নানা বিভ্রান্তির পরও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়ে কখনো প্রতিশোধের স্পৃহা জাগ্রত হয়নি এবং কখনো তিনি তাদের সাথে কোনো প্রকার অপব্যবহার বা কূটচালের বাসনাও পোষণ করেননি। মূলত তিনি সম্পূর্ণ এর বিপরীতমুখী চিন্তায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এদের মনোজগত অসুস্থ। এদের চিকিৎসা প্রয়োজন। এরা দিকভ্রান্ত। এদের সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পথ দেখানো প্রয়োজন। (পৃ. ৩৫-৩৬)

পর্যালোচনা :

১. লেখক দাবি করেছেন, ‘নিশ্চয় একজন মানুষ সাধারণ মানবিক বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত এবং সাধারণত এ সম্মানের বিষয়টি সকল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে এতে কোনো তারতম্য নেই। ইসলামের এ দৃষ্টিভঙ্গিটি সকল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। ইসলামি শরিয়াতে সকল ক্ষেত্রেই মানবকুলের প্রতি এ মর্যাদা রয়েছে।’

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘আর আমরা অবশ্যই আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সাগরে তাদেরকে চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে উত্তম রিজিক দান করেছি আর আমরা যাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ [সুরা ইসরা : ৭০]

এ আয়াতটি লেখকও উদ্ধৃত করেছেন। তবে এর ব্যাখ্যা তিনি নিজের মতো করে করেছেন। আল্লাহ তাআলা আয়াতে আদম-সন্তানকে সম্মানিত ও মর্যাদাবান করার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু এই মর্যাদাবান করার কী অর্থ? আয়াতের পরবর্তী অংশেই কিন্তু তা বিবৃত হয়েছে :

‘স্থলে ও সাগরে তাদেরকে চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে উত্তম রিজিক দান করেছি আর আমরা যাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’

এ ছাড়াও কুরআনে আল্লাহ বলেন :

وَصَوَّرَكُمْ فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ

তিনি তোমাদের আকৃতি দান করেছেন। তিনি তোমাদের আকৃতিকে সুন্দর করেছেন।

لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ

আমি মানুষকে সবচে সুন্দর গঠনে সৃষ্টি করেছেন।

خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا

তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা সব সৃষ্টি করেছেন।

وَسَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِنْهُ

তিনি আকাশসমূহ এবং পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তা সবই তোমাদের জন্য বশীভূত করে দিয়েছেন।

কুরআনের এক আয়াতের তাফসির তো অন্যান্য আয়াতই করে দিচ্ছে। উপরিউক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও আল্লাহ মানুষকে আকল (বিবেক) দিয়েছেন; যা দ্বারা সে ভালো-মন্দ চিনতে পারে, আলো-অন্ধকারের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। আদম-সন্তানের ওপর তাঁর এ ধরনের নিয়ামত রয়েছে অসংখ্য, অগণিত।

আল্লাহ বান্দাকে মর্যাদা দান করা এবং অনেক সৃষ্টিজীবের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়ার অর্থ হলো এই। কিন্তু লেখক এই শব্দ থেকে এ ফিকহ উদঘাটন করতে চান যে, ‘আল্লাহ তাআলা সব মানুষকে সমভাবে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন। ইসলামি শরিয়ত কোনো ক্ষেত্রে ধর্মের কারণে মানুষের সম্মানের মধ্যে পার্থক্য করেনি।’ অথচ আল্লাহ তাআলা সুরা তিনে বলেন :

لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ (4) ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ (5)

আমি মানুষকে সবচে সুন্দর গঠনে সৃষ্টি করেছি। এরপর তাকে হীনতাগ্রস্তদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা হীনতম অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছি।

সবচে সুন্দর গঠনে সৃষ্ট মানবজাতি কেন হীনতাগ্রস্তদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা হীনতম অবস্থায় উপনীত হয়? কেন সে ক্ষতিগ্রস্ততায় পতিত হয়? কুরআন থেকেই সে জবাব খুঁজে নিই। সুরা আসরে আল্লাহ বলেন :

وَالْعَصْرِ (1) إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ (2) إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ (3)

কালের শপথ! বস্তুত মানুষ অতি ক্ষতির মধ্যে আছে। তারা ব্যতীত, যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং একে অন্যকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও একে অন্যকে সবরের উপদেশ দিয়েছে।

তো কুরআন থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা মানুষকে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে বিশেষ কিছু নিয়ামত দিয়ে সম্মানিত করেছেন। অনেক বিষয়ে সকল সৃষ্টিজীবের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এরপরও যারা তার প্রতি ইমান আনেনি এবং সৎকর্ম করেনি, তিনি তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বলে অভিহিত করেছেন। তাদেরকে হীনতাগ্রস্তদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা হীনতম অবস্থায় ছুড়ে দিয়েছেন।

তারা যদি সম্মানিতই হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলার এ নির্দেশ কেন—

قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ

কিতাবিদের মধ্যে যারা ইমান রাখে না আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি এবং আল্লাহ ও তার রাসুল যা কিছু হারাম করেছেন, সেগুলোকে হারাম মনে করে না এবং সত্য দীনকে নিজের দীন বলে স্বীকার করে না, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো; যাবত্‌ না তারা হেয় হয়ে নিজ হাতে জিযয়া আদায় করে। (সুরা তাওবা : ২৯)

হাদিসও কেন আমাদের কুফফারগোষ্ঠীর হীনতার কথা জানায়?

عَنْ تَمِيمٍ الدَّارِيِّ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: “لَيَبْلُغَنَّ هَذَا الأمرُ مَا بَلَغَ الليلُ وَالنَّهَارُ، وَلَا يَتْرُكُ اللَّهُ بَيْتَ مَدَر وَلَا وَبَر إِلَّا أَدْخَلَهُ هَذَا الدِّينَ، بعِزِّ عَزِيزٍ، أَوْ بِذُلِّ ذَلِيلٍ، عِزًّا يُعِزُّ اللَّهُ بِهِ الْإِسْلَامَ، وَذُلًّا يُذِلُّ اللَّهُ بِهِ الْكُفْرَ”، فَكَانَ تَمِيمٌ الدَّارِيُّ يَقُولُ: قَدْ عَرَفْتُ ذَلِكَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، لَقَدْ أَصَابَ مَنْ أَسْلَمَ مِنْهُمُ الخيرَ والشرفَ والعزَّ، وَلَقَدْ أَصَابَ مَنْ كَانَ مِنْهُمْ كَافِرًا الذُّلَّ وَالصَّغَارَ وَالْجِزْيَةَ

তামিম দারি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি, এই দীন সেই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যেখানে রাত-দিন পৌঁছেছে। আল্লাহর শহর-গ্রামের এমন কোনো ঘর রাখবেন না, যেখানে এই দীনকে প্রবেশ করাবেন না—সম্মানী ব্যক্তির সম্মানের সঙ্গে এবং লাঞ্ছিত ব্যক্তির লাঞ্ছনার সঙ্গে; এমন সম্মান, যার মাধ্যমে আল্লাহ ইসলামকে সম্মানিত করবেন এবং এমন লাঞ্ছনা, যার মাধ্যমে আল্লাহ কুফরকে লাঞ্ছিত করবেন।’ তামিম দারি রা. বলতেন, ‘আমি আমার ঘরের মানুষদের মধ্যে এর যথার্থতা জেনেছি। তাদের মধ্য থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা কল্যাণ, মর্যাদা এবং সম্মান লাভ করেছে। আর তাদের মধ্যে যারা কাফিররূপে থেকেছে, তারা লাঞ্ছনা, হীনতা ও জিযয়ার শিকার হয়েছে।’ (মুসনাদু আহমাদ : ১৬৯৫৭। হাইসামি রহ. বলেন, আহমাদ রহ.-এর বর্ণনার বর্ণনাকারীগণ সহিহ গ্রন্থের বর্ণনাকারীবৃন্দই।)

তো এসব কিছু থেকে তো স্পষ্ট যে, আল্লাহ এক সাধারণ সম্মান সৃষ্টিগতভাবে দিয়েছিলেন। তবে পার্থিব জীবনে তিনি একমাত্র মুমিনদেরই সম্মানিত করেছেন। যারা ইমান আনে না, তারা এই সম্মান থেকে বঞ্চিত। এমনকি তাদেরকে এ জন্য শান্তির বাণীও শোনানো হয় না। ইসলামের বিধান অনুসারে কোনো কাফির-মুশরিককে সালাম দেওয়া যায় না। তারা যদি সম্মানিতই হতো, তাহলে তাদের সালাম দিতে দোষ ছিল কোথায়! কুরআন তো এদেরকে চতুষ্পদ জন্তু (যার মধ্যে কুকুর-শূকরও রয়েছে)-এর চাইতেও নিকৃষ্ট বলেছে।

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ ۖ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا ۚ أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ

আমি জিন ও মানুষের মধ্য থেকে বহুজনকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। …তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তারচেও বেশি বিভ্রান্ত। ওরাই গাফিল। (সুরা আরাফ : ১৭৯)

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেননি। সুতরাং আয়াতে কাদের কথা আলোচনা হচ্ছে, তা স্পষ্ট।

সুরা বায়্যিনাহর ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কাফিররা সৃষ্টির মধ্যে সবচে নিকৃষ্ট।’

লেখক কেন দুটো বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেছেন নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে একটিকে অপরটির স্থলে প্রয়োগ করেছেন, তা বোধগম্য নয়। ‘ইসলামি শরিয়াতে সকল ক্ষেত্রেই মানবকুলের প্রতি এ মর্যাদা রয়েছে।’ এ কথা তো আরও বেশি অস্পষ্ট। কারণ, বিষয়টা যদি এমনই হয়, তাহলে রাসুলুল্লাহ ﷺ কেন নির্দেশ দিলেন :

أخرجوا المشركين من جزيرة العرب

‘আরব উপদ্বীপ থেকে ইহুদি এবং খ্রিষ্টানদের বহিষ্কার করো।’ (সহিহ বুখারি)

 আবার নিজেও বলছেন :

لأخرجن اليهود والنصارى من جزيرة العرب حتى لا أدع إلا مسلماً

‘অবশ্যই আমি ইহুদি এবং খ্রিষ্টানদের আরব উপদ্বীপ থেকে বহিষ্কার করব। এমনকি মুসলমান ছাড়া আর কাউকে এখানে রাখব না।’ (সহিহ মুসলিম)

এর কারণ কি এ নয় যে, আরব উপদ্বীপ হলো সম্মানিত ভূমি। এখানে শুধু সম্মানিত মানুষরাই থাকবে। কুরআনের ভাষায় মুশরিকরা হলো নাপাক। দেহ নাপাক নয়; কিন্তু অস্তিত্বই নাপাক। তাই এই গোষ্ঠী কিছুতেই এ পবিত্র ভূমিতে থাকতে পারে না। ‘ইসলামি শরিয়াতে সকল ক্ষেত্রেই মানবকুলের প্রতি এ মর্যাদা রয়েছে’—এ কথা তাহলে কীভাবে সত্য হয়?

২. লেখক দাবি করেছেন, ‘কোনো মানুষকে অন্যায়ভাবে অপদস্থ করা বা কারও প্রতি জুলুম করা কিংবা স্বীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং তার মর্যাদাহানি করা বৈধ নয়।’

তিনি এর পক্ষে দলিল দিয়েছেন কুরআনের আয়াত :

‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করবে না।’ [সুরা আনআম : ১৫১]

এখন কথা হলো, আল্লাহ কার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন?

লেখক নিজেই তাফসিরে কুরতুবির উদ্ধৃতিতে এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন।

‘ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ হওয়া প্রাণকে হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে; চাই সেটি মুমিনের প্রাণ হোক কিংবা চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের প্রাণ হোক।’

এখানে ইমাম কুরতুবি রহ. স্পষ্ট বলছেন, আল্লাহ দুই শ্রেণির মানুষের প্রাণ হত্যাকে নিষিদ্ধ করেছেন : (১) মুমিন; (২) চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম। কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে এটাই যথার্থ মত। কিন্তু লেখক ইমাম কুরতুবি রহ.-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করা সত্ত্বেও এর প্রয়োগ করছেন মনগড়াভাবে। তিনি লেখেন, ‘কুরআন কারিমের এ আদেশটি ব্যাপক অর্থবোধক। কাজেই মুসলিম এবং অমুসলিম সকল মানবপ্রাণই এখানে উদ্দেশ্য। অতএব, ইসলামের আদল তথা ইনসাফ ও ন্যায়ের বাস্তবায়নও সাধারণভাবে সকলের জন্যই সমহারে প্রযোজ্য হবে। ধর্ম ও বর্ণ বিবেচনায় এখানে তারতম্য করা যাবে না।’

সহিহ বুখারি এবং সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :

أمرت أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إله إلا الله وأن محمدًا رسول الله، ويقيموا الصلاة، ويؤتوا الزكاة، فإذا فعلوا ذلك عصموا مني دماءهم وأموالهم بحق الإسلام وحسابهم على الله

আমি মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই ও মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল এবং তারা যথাযথভাবে নামাজ আদায় করে এবং জাকাত প্রদান করে। যদি তারা এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ হতে তাদের প্রাণ ও সম্পদের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করল।… (বুখারি : ২৫, ৩৯২, ১৩৯৯; সহিহ মুসলিম : ৩০)

এই সহিহ হাদিস থেকে প্রতিভাত হচ্ছে, যারা ইমান আনবে, একমাত্র তারাই প্রাণ এবং সম্পদের নিরাপত্তা লাভ করবে। অন্যান্য হাদিসের আলোকে চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমদেরও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তিহীন অমুসলিমের প্রাণ, সম্পদ ও সম্মান তো আল্লাহ তাআলা সম্মানিত করেননি। তাহলে সেগুলোর সুরক্ষাও কেন ইসলাম দেবে? চুক্তিহীন কাফিরকে হত্যা করলে ইসলাম কেন তার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করেনি? কেন তাদের গিবত-সমালোচনা করাকেও হারাম ঘোষণা করেনি? সুতরাং ইসলাম যাকে সুরক্ষাই দেয়নি, তার সঙ্গে কৃত আচরণ তো জুলুম হিসেবে গণ্য হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

৩. এই পয়েন্টে লেখক যা লিখেছেন, তা পড়লে তো রীতিমতো গা শিউরে ওঠে। লেখক দাবি করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এক সাধারণ ইহুদির লাশের সম্মানার্থে নিজেও দাঁড়িয়েছেন এবং সাহাবিদেরও দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। কথাটি তার মুখেই আরেকবার শোনা যাক :  

‘এক ইহুদির জানাযা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি দাঁড়িয়েছিলেন (সহিহ বুখারি : ১৩১২)—এ ঘটনাটি উল্লেখ করার পর লেখক বলেন, ‘নবি ﷺ প্রদর্শিত এ পন্থা বা অবস্থানটি কি শ্রেষ্ঠতর নয়? এটাই হচ্ছে একজন মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ ﷺ উপরিউক্ত অবস্থান এবং আচরণবিধির মাধ্যমে সকল শ্রেণির মানুষের জন্য মুসলিমদের হৃদযন্ত্রে আত্ম-উপলব্ধি এবং সম্মানের বীজ বপন করেছেন। আর এরূপ সম্মানসূচক আচরণ তিনি সাধারণভাবেই করেছেন; ওই ইহুদির আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে করেছেন এবং অন্যদের এরূপ করার আদেশ দিয়েছেন—এ কথা জানার পরও যে, ওই লোকটি একজন ইহুদি ছিল।…

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এ সম্মানসূচক দাঁড়ানো সামান্যতম সময়ের জন্য ছিল না; বরং শবদেহটি অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছিল।… নিঃসন্দেহে এ অবস্থানটি সাহাবায়ে কেরাম, অনুরূপভাবে তৎপরবর্তী মুসলিমদের হৃদয়েও এ সুদৃঢ় চেতনা জাগ্রত করেছে যে, ইসলাম একজন মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে তার যথাযোগ্য মর্যাদা দেয় এবং সম্মানের চোখে দেখে।’ (পৃ. ২৬-২৮)

নাউজুবিল্লাহি মিন যালিকা। রাসুলুল্লাহ ﷺ কেন দাঁড়িয়েছিলেন, বিভিন্ন হাদিসে এর ব্যাখ্যা এসেছে। উদাহরণস্বরূপ :

إن للموت فزعا

নিশ্চয়ই মৃত্যুর বিচলতা রয়েছে। (অর্থাৎ তিনি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে দাঁড়িয়েছেন।) [বায়হাকি]

إنما قمنا للملائكة

আমরা শুধু ফিরিশতাদের সম্মানার্থে দাঁড়িয়েছি। [মুসতাদরাকে হাকিম]

إنما تقومون إعظاما للذي يقبض النفوس

তোমরা শুধু ওই সত্তার সম্মানার্থে দাঁড়াও, যে প্রাণসমূহ কবজা করে। [মুসনাদু আহমাদ]

إعظاما لله الذي يقبض الأرواح

আল্লাহর সম্মানার্থে দাঁড়াও, যিনি আত্মাসমূহ কবজা করেন। [সহিহ ইবনু হিব্বান]

إنما قام رسول الله صلى الله عليه وسلم تأذيا بريح اليهودي

রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়েছিলেন তো এ জন্য যে, ইহুদির দুর্গন্ধে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। {মুসনাদু আহমাদ]

كراهية أن تعلو رأسه

তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। কারণ, তিনি অপছন্দ করেছিলেন যে, ইহুদির মাথা (মুসলমানের মাথার চাইতে) উঁচু থাকবে। [বায়হাকি]

লেখক মহোদয় কীভাবে একই বর্ণনার উপরিউক্ত অংশগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে নিজের মনমতো কারণ বর্ণনা করলেন, সম্পাদকও কীভাবে দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেলেন, আমানতদার প্রকাশকও কীভাবে এসবই ছাপিয়ে দিলেন, অনুবাদকও কীভাবে দম্ভোক্তি করে বইয়ের ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্যকারীর দিকে চ্যালেঞ্জের তির ছুড়ে দিলেন—তা আমার বোধগম্য নয়।

বর্ণনার উপরিউক্ত অংশগুলোকে যদি বাদও দেওয়া হয়, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কথা—‘সে কি মানুষ নয়’-কেই যদি একমাত্র কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবুও তো এর দ্বারা লেখকের দাবি প্রমাণিত হয় না। কারণ, আলিমগণের অজানা নয় যে, মৃত ব্যক্তির লাশ দেখলে দাঁড়ানো হবে কি না—এ মাসআলা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ এটাকে মুসতাহাব বলেন, আর অনেকেই এটাকে নাজায়িয বলেন। এমনকি ওয়াজিব হওয়ার মতও কারও কারও থেকে বর্ণিত আছে। উভয় পক্ষেরই দলিল রয়েছে। ইসলামের শুরুর দিকে মুসলমানদের মধ্যে মৃত ব্যক্তির লাশ দেখলে দাঁড়ানোর প্রচলন ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে একাধিক হাদিসের মাধ্যমে এটাকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। তো এটা ছিল নিষিদ্ধতা আসার পূর্ববর্তী হাদিস। যে সময় মুসলমানগণ লাশ দেখলে দাঁড়াতেন। দাঁড়ানোর কারণ লাশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয়। বরং কারণ হলো সেগুলো, যা এই হাদিসেরই অন্যান্য অংশে বর্ণিত রয়েছে।

তো রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন ইহুদির লাশ দেখে দাঁড়ালেন, তখন সাহাবিগণ আপত্তি জানিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, সে তো ইহুদি। তাদের এ আপত্তির কারণই হলো, আল্লাহর রাসুলের সান্নিধ্যে থেকে তারা এ শিক্ষা অর্জন করেছিলেন যে, যারা আল্লাহ এবং তার রাসুলকে অস্বীকার করে, তারা মোটেও সম্মান পাওয়ার উপযুক্ত নয়। তো তাদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের জানান, আমি দাঁড়িয়েছি ইহুদির প্রতি সম্মানার্থে নয়। বরং দাঁড়িয়েছি, কারণ যেকোনো লাশ দেখলেই আমাকে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এটাও তো একটা লাশই। যদিও কোনো সম্মানিত মানুষের লাশ নয়; বরং এক হীন লোকের লাশ। আর দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য তো হলো আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্মান জ্ঞাপন এবং মৃত্যুর কথা স্মরণ।

৪. লেখকের আরেকটি জঘন্য দাবি হলো, ‘মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক, সম্ভাব্য বরং অনিবার্য বিষয়। কেননা (পরবর্তীকালে) কখনো এমন কোনো কাল আসেনি, যখন কোনো একটি ইস্যুতে সকল আলিম ঐকমত্য পোষণ করতেন। এমনকি উলুহিয়্যাত ও তাওহিদের মতো ইস্যুতেও। কাজেই মুসলিমগণ এ কথা খুব সহজেই মেনে নেয় যে, আকিদাগত দিক থেকে ভিন্ন মতাবলম্বী থাকতেই পারে এবং তারা এ কথাও জানে যে, এদেরকে একেবারে দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত করাও অসম্ভব। এ জন্যই মুসলিমগণ বিরুদ্ধবাদীদের সাথে স্বাভাবিকভাবেই সহাবস্থান মেনে নেয় এবং এ জন্যই ইসলামি শরিয়াত অমুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে সর্বোত্তম, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুস্পষ্ট আচরণ পরিকাঠামো প্রদর্শন করে।’

লেখক আলিমগণের ইখতিলাফের দলিল দেখিয়ে কুফর-শিরককে মেনে নেওয়ার দাওয়া পেশ করলেন। এ কাজ কোনো প্রাচ্যবিদ করলে মনকে প্রবোধ দেওয়া যেত। কিন্তু…! ‘মুসলিমগণ এ কথা খুব সহজেই মেনে নেয় যে, আকিদাগত দিক থেকে ভিন্ন মতাবলম্বী থাকতেই পারে এবং তারা এ কথাও জানে যে, এদেরকে একেবারে দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত করাও অসম্ভব’—বিষয়টা যদি এমনই হতো, তাহলে আল্লাহ তাআলা কেন নির্দেশ দিলেন :

 وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ

তোমরা কাফিরদের সঙ্গে লড়াই করো, যাবত্‌ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। (সুরা আনফাল : ৩৯)

আর প্রকাশ থাকে যে, কুফরের চাইতে বড় কোনো ফিতনা হতে পারে না। ইমাম কুরতুবি তাঁর তাফসিরগ্রন্থে এই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে বলেন, ‘ফিতনা : অর্থাৎ কুফর।’

যদি বিষয়টা অসম্ভবই হতো, তাহলে আল্লাহ কেন অসম্ভব (!) বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছেন? আর লেখকের কি জানা নেই যে, ইসা আ.-এর আগমনের পর এবং দাজ্জালের বিনাশের পর পৃথিবীতে শুধু এবং শুধু মুসলমানদের বাস থাকবে। অমুসলিমমুক্ত এক পৃথিবী সে সময়ের লোকেরা উপভোগ করবে। এটা তো কুরআন-সুন্নাহর কোনো পাঠকের অজানা থাকার কথা নয়। এরপরও তিনি কীভাবে এমনটা দাবি করেন?

‘এ জন্যই মুসলিমগণ বিরুদ্ধবাদীদের সাথে স্বাভাবিকভাবেই সহাবস্থান মেনে নেয়’। কী জঘন্য মিথ্যাচার! যেন তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এ হাদিসটি পড়েননি :

” أَنَا بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ يُقِيمُ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ “. قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ، لِمَ ؟ قَالَ : ” لَا تَرَاءَى نَارَاهُمَا “.

আমি প্রত্যেক এমন মুসলমান থেকে দায়মুক্ত, যে মুশরিকদের মধ্যে বসবাস করে। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, এর কারণ কী? তিনি বললেন, দু-অঞ্চলের আগুনকে এক দৃষ্টিতে দেখা যাবে না। [সুনানু আবি দাউদ : ২৬৪৫; সুনানুত তিরমিজি : ১৬০৪]

ইমাম তিরমিজির বর্ণনায় আরও এসেছে :

لَا تُسَاكِنُوا الْمُشْرِكِينَ، وَلَا تُجَامِعُوهُمْ، فَمَنْ سَاكَنَهُمْ، أَوْ جَامَعَهُمْ، فَهُوَ مِثْلُهُمْ

‘তোমরা মুশরিকদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করো না। তাদের সংসর্গেও যেয়ো না। যে মানুষ তাদের সঙ্গে বসবাস করবে অথবা তাদের সংসর্গে থাকবে, সে তাদের অনুরূপ বলে বিবেচিত হবে।’ [সুনানুত তিরমিজি : ১৬০৫]

৫. লেখক দাবি করেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, অমুসলিমদের দীর্ঘকাল ধরে আল্লাহর রাস্তা থেকে বিমুখ হয়ে থাকা এবং দীন ইসলাম নিয়ে তাদের নানা বিভ্রান্তির পরও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়ে কখনো প্রতিশোধের স্পৃহা জাগ্রত হয়নি এবং কখনো তিনি তাদের সাথে কোনো প্রকার অপব্যবহার বা কূটচালের বাসনাও পোষণ করেননি।’

এই পয়েন্টের পর্যালোচনায় বেশি কিছু বলতে প্রবৃত্তি হচ্ছে না। যে ব্যাপারটা ভেবে প্রতিটা লাইন লেখার সময় বিরক্তি হচ্ছে, তা হলো, একটি মানহাজি ধারার প্রকাশনী কীভাবে ব্যবসার দিকটাকেই প্রাধান্য দিয়ে কিংবা অন্য যেকোনো উদ্দেশ্যে অনেকের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বা নিজেরা জেনেবুঝেও মডারেট ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে মাঠে নামল! যাহোক, এখানে শুধু সহিহ মুসলিমের ২৮৬৫ নম্বর হাদিস উল্লেখ করে বই পর্যালোচনার এ পর্বের ইতি টানছি।

وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي أَنْ أُحَرِّقَ قُرَيْشًا، فَقُلْتُ : رَبِّ، إِذَنْ يَثْلَغُوا رَأْسِي فَيَدَعُوهُ خُبْزَةً. قَالَ : اسْتَخْرِجْهُمْ كَمَا اسْتَخْرَجُوكَ، وَاغْزُهُمْ نُغْزِكَ، وَأَنْفِقْ فَسَنُنْفِقُ عَلَيْكَ، وَابْعَثْ جَيْشًا نَبْعَثْ خَمْسَةً مِثْلَهُ، وَقَاتِلْ بِمَنْ أَطَاعَكَ مَنْ عَصَاكَ

‘কুরাইশকে জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।’ ‘আমি তখন বললাম, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমি যদি এ কাজ করি, তাহলে তারা তো আমার মাথা ভেঙে রুটির মতো টুকরো টুকরো করে ফেলবে’! আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘তারা যেভাবে তোমাকে বহিষ্কার করেছে, তুমিও ঠিক সেভাবে তাদেরকে বহিষ্কার করো। তুমি তাদের সাথে যুদ্ধ করো, আমি তোমাকে সাহায্য করব। (আমার পথে) ব্যয় করো, তোমার জন্যও ব্যয় করা হবে। তুমি একটি বাহিনী প্রেরণ করো, আমি অনুরূপ পাঁচটি বাহিনী প্রেরণ করবো, যারা তোমার আনুগত্য করে, তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে যারা তোমার বিরুদ্ধাচারণ করে তাদের সাথে লড়াই করো।’

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

Share This