সুরা কাহফ তিলাওয়াতকালে প্রশান্তি নাজিল হয়

বারা ইবনু আজিব রা. বর্ণনা করেন,

كَانَ رَجُلٌ يَقْرَأُ سُورَةَ الْكَهْفِ وَإِلَى جَانِبِهِ حِصَانٌ مَرْبُوطٌ بِشَطَنَيْنِ ، فَتَغَشَّتْهُ سَحَابَةٌ، فَجَعَلَتْ تَدْنُو، وَتَدْنُو، وَجَعَلَ فَرَسُهُ يَنْفِرُ، فَلَمَّا أَصْبَحَ أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ، فَقَالَ : ” تِلْكَ السَّكِينَةُ تَنَزَّلَتْ بِالْقُرْآنِ

এক ব্যক্তি[1] সুরা কাহফ তিলাওয়াত করছিলেন। তার ঘোড়াটি দুটো রশি দিয়ে তার পাশে বাঁধা ছিল। তখন এক টুকরো মেঘ এসে তার ওপর ছায়া দান করল। মেঘখণ্ড ক্রমেই নিচের দিকে নেমে আসতে লাগল। আর তার ঘোড়াটি ভয়ে লাফালাফি শুরু করে দিলো। সকাল বেলা যখন লোকটি নবি সাঃ-এর কাছে উক্ত ঘটনার কথা ব্যক্ত করেন, তখন তিনি বললেন, এ ছিল সাকিনা (প্রশান্তি), যা কুরআনের কারণে নাযিল হয়েছিল।[2]

দাজ্জালের মোকাবিলায় সুরা কাহফ

নাওয়াস ইবনু সামআন রা. বর্ণনা করেন,

إِنْ يَخْرُجْ وَأَنَا فِيكُمْ، فَأَنَا حَجِيجُهُ دُونَكُمْ، وَإِنْ يَخْرُجْ وَلَسْتُ فِيكُمْ، فَامْرُؤٌ حَجِيجُ نَفْسِهِ وَاللهُ خَلِيفَتِي عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ، إِنَّهُ شَابٌّ قَطَطٌ، عَيْنُهُ طَافِئَةٌ، كَأَنِّي أُشَبِّهُهُ بِعَبْدِ الْعُزَّى بْنِ قَطَنٍ، فَمَنْ أَدْرَكَهُ مِنْكُمْ، فَلْيَقْرَأْ عَلَيْهِ فَوَاتِحَ سُورَةِ الْكَهْفِ، فَإِنَّهَا جِوَارُكُمْ مِنْ فِتْنَتِهِ

আমি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয়, তবে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করব; তোমাদের প্রয়োজন হবে না। আর যদি আমি তোমাদের মাঝে না থাকাবস্থায় দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয়, তবে প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি নিজের পক্ষ হতে তাকে প্রতিহত করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আল্লাহ তাআলাই হলেন আমার পক্ষ হতে তত্ত্বাবধানকারী। দাজ্জাল ঘন চুলবিশিষ্ট যুবক হবে। তার চোখ হবে আঙ্গুরের মতো। আমি তাকে কাফির আবদুল উজ্জা ইবনু কাতান’র মতো মনে করছি। তোমাদের যে-কেউ দাজ্জালের সাক্ষাৎ পাবে, সে যেন তার ওপর সুরা কাহফের প্রথমোক্ত আয়াতসমূহ পাঠ করে। কারণ, এটাই হবে ফিতনা থেকে তার নিরাপত্তার প্রধান উপায়।[3]

সুরা কাহফ পাঠ করার ফজিলত

আবু সাইদ খুদরি রা. বর্ণনা করেন; রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন,

مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ كَمَا أُنْزِلَتْ، كَانَتْ لَهُ نُورًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ مَقَامِهِ إِلَى مَكَّةَ، وَمَنْ قَرَأَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ آخِرِهَا ثُمَّ خَرَجَ الدَّجَّالُ لَمْ يُسَلَّطْ عَلَيْهِ

যে ব্যক্তি সুরা কাহফ যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে সেভাবে পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন তা তার জন্য নুর হবে, যা তার অবস্থানস্থল থেকে মক্কা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। আর যে ব্যক্তি এর শেষ দশ আয়াত পাঠ করবে, এরপর দাজ্জাল বের হলে তাকে তার ওপর প্রভাব বিস্তার করার শক্তি দেওয়া হবে না।[4]

সুরা কাহফ মুখস্থ রাখার ফজিলত

আবু দারদা রা. বর্ণনা করেন; রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন,

مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنَ الدَّجَّالِ… قَالَ شُعْبَةُ: مِنْ آخِرِ الْكَهْفِ، وقَالَ هَمَّامٌ: مِنْ أَوَّلِ الْكَهْفِ

যে ব্যক্তি সুরা কাহফের শুরু থেকে দশ আয়াত মুখস্থ রাখবে, সে দাজ্জাল থেকে সুরক্ষিত থাকবে। বর্ণনাকারী শুবার বর্ণনায় এসেছে, প্রথম দশ আয়াতের কথা। আর বর্ণনাকারী হাম্মামের বর্ণনায় এসেছে, শেষ দশ আয়াতের কথা।[5]

হাদিসের অর্থ হচ্ছে,

أن من قرأ هذه الآيات وتدبرها ووقف على معناها حذره فأمن منه

যে ব্যক্তি এই আয়াতগুলো পাঠ করবে, এগুলো নিয়ে চিন্তাফিকির করবে এবং এর অর্থ ও মর্মের ব্যাপারে অবগত হবে, সে দাজ্জালের ব্যাপারে সতর্ক হবে। ফলে তার থেকে নিরাপদ থাকবে।[6]

অর্থাৎ, হাদিসে যে মুখস্থের কথা বলা হয়েছে, এর দ্বারা হাকিকত ও তাৎপর্য না বুঝে স্রেফ তোতাপাখির মতো মুখস্থ করা উদ্দেশ্য নয়। এক হাদিসে আল্লাহ তাআলার উত্তম নামসমূহ (আসমায়ে হুসনা) মুখস্থ করার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন; রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন,

إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا، مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا، مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الجَنَّةَ

আল্লাহ তাআলার ৯৯টি, অর্থাৎ একটি কম ১০০টি নাম রয়েছে। যে তা মুখস্থ রাখবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।[7]

এর ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনুল আসির রহ. লেখেন,

مَنْ أَحْصَاهَا عِلْماً بِهَا وَإِيمَانًا.

যে ব্যক্তি এগুলো মুখস্থ রাখবে এভাবে যে, সে এর ইলম অর্জন করবে এবং এর প্রতি ইমান (সুদৃঢ় বিশ্বাস) রাখবে।

وَقِيلَ: أَرَادَ مَن أَطَاقَ العَمَل بِمُقْتَضَاهَا، مِثْل مَنْ يَعْلم أَنَّهُ سَمِيعٌ بَصِيرٌ فيَكُفُّ لسانَه وسَمْعه عمَّا لَا يَجُوزُ لَهُ، وَكَذَلِكَ بَاقِي الْأَسْمَاءِ.

আরেকটি মত হচ্ছে, সে এগুলোর দাবির আলোকে আমল করবে। উদাহরণস্বরূপ, যে ব্যক্তি জানে, আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা। সে তার এই ইলমের আলোকে তার জিহ্বা ও শ্রবণেন্দ্রিয়কে নাজায়িয বিষয় থেকে দূরে রাখবে। অন্যান্য নামগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা।[8]

আল্লামা মুহাম্মাদ তাহের পাটনি রহ. লেখেন,

‘আখেরি জামানার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুসিবত হবে দাজ্জালি ফিতনা। এর থেকে হেফাজত লাভের জন্য হাদিস শরিফে সুরা কাহাফ নিয়মিত তেলাওয়াত করার তাকিদ করা হয়েছে। যেভাবে আসহাবে কাহাফ জালিম বাদশাহর কুফরি ফিতনা থেকে ইমানসহ হেফাজত ও নিরাপদ ছিল, সুরা কাহফের আমলকারী ব্যক্তিও এভাবে হেফাজত ও নিরাপদ থাকবে। এছাড়াও প্রত্যেক ওই দাজ্জাল (ধোঁকাবাজ), যে কথা ও কাজের মাধ্যমে ধোঁকাবাজি করে, সুরা কাহফের আমলকারী তার ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে। দাজ্জালের আশ্চর্যজন চেহারা-সুরত, স্বভাব-প্রকৃতি, আচরণ ও নিদর্শন এ সুরার বিভিন্ন আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। যে ব্যক্তি সুরা কাহফের প্রতি মনোযোগী হবে এবং এর আয়াতসমূহ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করবে, সে কোনো ফিতনায় ফাঁসবে না।

আমার মনে হয়, সুরা কাহফের এ স্বাতন্ত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব এমন কোনো বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতির কারণে, যা রাসুলুল্লাহ সাঃ-এর জানা ছিল।’[9]

সায়্যিদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. লেখেন,

‘সুরা কাহফ কুরআনের জরুরি এমন একটি একক সুরা, যাতে শেষ জামানার ছোট-বড়, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের ফিতনা থেকে বাঁচার সবচেয়ে বেশি উপায়-উপকরণ রয়েছে। যার মধ্যে দাজ্জালের ফিতনা সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। এ সুরায় ফিতনাসমূহের গতি ও প্রকৃতি যেভাবে বর্ণিত আছে, তেমনি তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পন্থাও নির্দেশিত রয়েছে। সুরা কাহফে এমন সতর্কবাণী রয়েছে, যা দাজ্জালের মতো ভয়ংকর ফিতনাকেও রুখে দিতে পারে এবং দাজ্জালের প্রভাব-প্রতাপকে পরাস্ত করতে পারে। এ সুরা যেভাবে আখেরি জামানার ফিতনাগুলো চিহ্নিত করতে পারে, তেমনি সেগুলো নিশ্চিহ্নও করতে পারে। ছোট-বড় যেকোনো ফিতনাকেই এই সুরা নির্মূল করতে পারে। কেউ যদি এ সুরার সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্ক করে নেয় এবং এর অর্থ ও মর্ম প্রাণে গেঁথে নেয়, যার পদ্ধতি হলো, এ সুরা মুখস্থ করে নেওয়া এবং বেশি বেশি তেলাওয়াত করা, তাহলে সে কিয়ামতপূর্ব সব ধরনের ফিতনা থেকে মুক্ত থাকবে। দাজ্জালের মতো ভয়ংকর ফিতনা থেকেও মুক্ত ও নিরাপদ থাকবে।’

সুরা কাহফ অবতরণের প্রেক্ষাপট

ইমাম ইবনু জারির তবারি রহ. তার তাফসিরগ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক রহ. সূত্রে সাহাবি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, কুরাইশ কাফিররা নজর বিন হারিস ও উকবা ইবনু আবি মুয়িত নামক দুই ব্যক্তিকে মদিনার ইহুদিদের কাছে পাঠিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, রাসুলুল্লাহ সাঃ-এর গুণাবলি, বাণী ও আদর্শ তাদের সামনে উপস্থাপন করে তাদের প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থের আলোকে তার ব্যাপারে তাদের মূল্যায়ন জানা। তাদের সব কথাবার্তা শুনে ইহুদি আলিমরা তাদেরকে পরামর্শ দিলো, তোমরা তাকে তিনটি প্রশ্ন করবে। যদি তিনি এর সঠিক উত্তর দিতে সমর্থ হন, তাহলে প্রমাণিত হবে, তিনি প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর নবি। আর যদি তিনি এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে প্রমাণিত হবে, তার নবুওয়াতের দাবি সঠিক নয়; বরং তা ভিত্তিহীন। তাদের প্রশ্ন তিনটি ছিল :

  • অতীতে কোনো এক কালে একদল যুবক শিরক থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের জন্মভূমি ত্যাগ করে একটি পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করেছিল। তাদের প্রকৃত ঘটনা কী?
  • সেই ব্যক্তির বৃত্তান্ত বলুন, যে উদয়াচল থেকে অস্তাচল পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবী ভ্রমণ করেছিল।
  • রুহ (আত্মা)-এর হাকিকত কী?

এরপর নজর বিন হারিস ও উকবা ইবনু আবি মুয়িত মক্কায় ফিরে আসল এবং কুরাইশরা ইহুদি আলিমদের পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ সাঃ-কে প্রশ্ন তিনটি করল।

মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক রহ. যার সূত্রে এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন, তিনি অজ্ঞাত। হাদিসশাস্ত্রের নীতি অনুসারে তাই এ বর্ণনাটি নির্ভরযোগ্য নয়। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহ. তাফসিরশাস্ত্রের বর্ণনাগুলোর মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বর্ণনার ভান্ডার হচ্ছে এই শাস্ত্র। বর্ণনাসূত্র ছাড়াও যৌক্তিকভাবেও এই শানে নুজুলটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এতে উল্লেখিত প্রশ্ন তিনটির বাকি দুটো উল্লেখ করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা আশ্চর্যজনক শব্দ ব্যবহার করেননি, যা এই ঘটনা বর্ণনা করার ক্ষেত্রে করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি মনে করো, গুহা ও রাকিমবাসীরা আমার নিদর্শনাবলির মধ্যে এক বিস্ময়কর নিদর্শন ছিল?’ অথচ ইতিহাস থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায়, গুহাবাসীদের ঘটনা ছিল আরব ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি ঘটনা। এমন একটি প্রসিদ্ধ ঘটনাকে নবুওয়াতের সত্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড বানানো কীভাবে যৌক্তিক হতে পারে? প্রসিদ্ধির কথা বাদ দিলেও কোনো ঐতিহাসিক বিষয় বলতে পারা কেন নবুওয়াতের সত্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড হবে? নবিগণ কি পৃথিবীকে মানুষকে সঠিক ইতিহাস শেখানোর জন্য আগমন করেছিলেন? তাছাড়া আল্লাহ তাআলা যেখানে রুহ (আত্মা) ও যুল কারনাইনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন, সেখানে স্পষ্টভাবে বলেছেন ‘তারা আপনাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে’। দ্রষ্টব্য—সুরা ইসরা : ৮৫ এবং সুরা কাহফ : ৮৩। যার দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়, এ দুটো আসলে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু আসহাবে কাহফের বর্ণনা তুলে ধরতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেননি যে, ‘তারা আপনাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে’; যার দ্বারা কুরআনের আলোকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই যে, এটা প্রশ্ন ছিল। উপরন্তু কোনো সহিহ হাদিসেও এ ব্যাপারে আলোচনা আসেনি যে, আসহাবে কাহফের আলোচনা অবতীর্ণ করার কারণ ছিল মুশরিকদের প্রশ্ন।

যাহোক, এ সুরায় বিস্তৃতভাবে আসহাবে কাহফ (গুহাবাসী)-এর আলোচনা স্থান পেয়েছে। সুরার শেষের দিকে জুলকারনাইনের আলোচনাও এসেছে। তিনিই পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছিলেন। এছাড়াও মুসা আ.-এর ইলমি সফর এবং খাজির আ.-এর সাথে সাক্ষাতের কথাও বিবৃত হয়েছে। এ ঘটনা তিনটিই হলো এ সুরার মৌলিক আলোচ্য বিষয়। তবে এতে দাজ্জালি ফিতনা, খ্রিষ্টানদের অসার আকিদা, দুই বাগিচার মালিকের প্রতীকী ঘটনাসহ প্রাসঙ্গিক আরও অনেক বিষয় আলোচিত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সুরাটি কি বাস্তবেই মুশরিকদের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছিল? এর উত্তর হচ্ছে, না। বিষয়টি লোকমুখে বেশ প্রচলিত হলেও সুরা কাহফ অবতীর্ণ হওয়ার কারণ উল্লেখিত ঘটনাটি নয়। এক্ষেত্রে প্রথমে একটি মূলনীতি বোঝা দরকার। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি রহ. তার কুরআন বোঝার মূলনীতি বিষয়ক গ্রন্থে লেখেন,

حقيقة أسباب النزول: وقد ربط عامة المفسرين كل آية من آيات الأحكام وآيات المخاصمة[10] بقصة تروى في سبب نزولها، وظنوا أنها هي سبب النزول، والحق أن نزول القرآن الكريم إنما كان لتهذيب النفوس الإنسانية، وإزالة العقائد الباطلة، والأعمال الفاسدة.

فالسبب الحقيقي – إذن – في نزول آيات المخاصمة هو وجود العقائد الباطلة في نفوس المخاطبين. وسبب نزول آيات الأحكام إنما هو شيوع المظالم ووجود الأعمال الفاسدة فيهم. وسبب نزول آيات التذكير (بآلاء الله وأيامه وبالموت) إنما هو عدم تيقظهم وتنبههم بما يرون ويمرون عليه من آلاء الله وأيامه، وحوادث الموت، وما سيكون بعده من وقائع هائلة.

أما الأسباب الخاصة والقصص الجزئية التي تجشم بيانها المفسرون فليس لها دخل في ذلك إلا في بعض الآيات الكريمة، التي تشتمل على تعريض بحادث من الحوادث في عهد النبي – صلى الله عليه وسلم – أو قبله، بحيث يقع القارئ بعد هذا التعريض في ترقب وانتظار لما كان وراءه من قصة أو حادث أو سبب، ولا يزال ترقبه إلا بسيط القصة وبيان سبب النزول. لأجل ذلك يلزمنا أن نشرح هذه العلوم بطريقة لا نحتاج معها إلى إيراد قصص جزئية.

অধিকাংশ তাফসিরকারগণ তর্কশাস্ত্রীয় ও বিধানশাস্ত্রীয় প্রতিটি আয়াতকে কোনো ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তাদের ধারণা, এসব ঘটনা উক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার কারণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কুরআন অবতীর্ণ করার মুখ্য উদ্দেশ্য হলো, মানবাত্মাকে পরিশুদ্ধ করা, ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাসের মূলোৎপাটন করা, সব ধরনের অন্যায়-অনাচার নির্মূল করা। তাই শরিয়ত পালনে আদিষ্ট বান্দাদের অন্তরে গলদ আকিদার অস্তিত্বই তর্কশাস্ত্রীয় আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার যথার্থ কারণ। গর্হিত কাজের অস্তিত্ব এবং বান্দাদের মধ্যে জুলুম-অত্যাচারের প্রসার বিধানশাস্ত্রীয় আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার মূল কারণ। আর আল্লাহর যেসব নেয়ামত তারা দৈনন্দিন প্রত্যক্ষ ও উপভোগ করছে, যেসব দিন তারা অতিক্রম করছে, মৃত্যুর বিভীষিকা এবং মৃত্যু-পরবর্তী আখিরাতের ভয়ানক অবস্থাসমূহের ব্যাপারে অসচেতনা থাকা এবং এগুলোর প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা (আল্লাহর নেয়ামত, যাপিত দিবস এবং মৃত্যুর) উপদেশ-সংক্রান্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার মূল কারণ।

মুফাসসিরগণ কষ্ট করে একেকটি আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনা বর্ণনা করেন, সাধারণভাবে এগুলোর কোনো ভূমিকা নেই। তবে অল্প কয়েকটি আয়াত এমন রয়েছে, যাতে রাসুলুল্লাহ সাঃ-এর সময়ের বা তার পূর্বের কোনো যুগের বিশেষ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত রয়েছে, যা সামনে আসলে এই ইঙ্গিতের পেছনে থাকা কাহিনী, ঘটনা বা কারণ জানার পাঠকের ভেতরে আগ্রহ ও প্রতীক্ষা তৈরি হয়। বিস্তারিত ঘটনা ও আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ জানার আগে তার অস্থিরতা ও প্রতীক্ষার সমাপ্তি ঘটে না। এ কারণে আমাদের জন্য অপরিহার্য হলো, আমরা তাফসিরের জ্ঞানসমূহকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করব, যাতে প্রাসঙ্গিক ঘটনা উল্লেখ করার কোনো প্রয়োজন না দেখা দেয়।[11]

এরপর দ্বিতীয়ত আমাদের বোঝা দরকার, আল্লাহ তাআলা কুরআনে বিভিন্ন ঘটনা কেন বর্ণনা করেন। কুরআন তো কোনো ইতিহাসগ্রন্থ নয়। সুরা ইউসুফের সর্বশেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন,

لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَلَكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

নিশ্চয়ই তাদের ঘটনায় বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের উপাদান রয়েছে। এটা এমন কোনো বাণী নয়, যা মিছামিছি গড়ে নেওয়া হয়েছে। বরং এটা এর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থক, সবকিছুর বিশদ বিবরণ এবং যারা ইমান আনে তাদের জন্য হিদায়াত ও রহমতের উপকরণ।[12]

وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ وَجَاءَكَ فِي هَذِهِ الْحَقُّ وَمَوْعِظَةٌ وَذِكْرَى لِلْمُؤْمِنِينَ

আমি আপনাকে রাসুলগণের এমন সব ঘটনা শোনাচ্ছি, যা দ্বারা আমি আপনার অন্তরে শক্তি জোগাই। আর এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে আপনার কাছে যে বাণী এসেছে, তা সত্য এবং মুমিনদের জন্য উপদেশ ও স্মারক।[13]

فَاقْصُصِ القَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ

আপনি ঘটনা বর্ণনা করুন, যেন তারা চিন্তা-ভাবনায় রত হয়।[14]

রাসুলুল্লাহ সাঃ-এর মক্কিজীবনে মুসলমানরা অনেক দুর্বল ছিল। বহু ধরনের নির্যাতন তাদের সয়ে নিতে হয়েছে। বেলাল, সুহাইব, আম্মার, ইয়াসির, সুমাইয়া, খাব্বাব রা. প্রমুখের ঘটনা তো সর্বজনবিদিত। আসহাবে কাহফের অবস্থার সঙ্গে তাদের অবস্থা ছিল বড়ই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে তাদের সেই অবস্থা চিত্রিত করে বলেন,

وَاذْكُرُوا إِذْ أَنْتُمْ قَلِيلٌ مُسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُونَ أَنْ يَتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ

স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন তোমরা ছিলে অল্প ক’জন। পৃথিবীতে তোমাদেরকে দুর্বল বলে মনে করা হতো। তোমরা তখন আশঙ্কায় থাকতে, হঠাৎ কেউ না আবার তোমাদের ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায়।[15]

এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি, মক্কার যুগে মুসলমানদের সকরুণ অবস্থায় তাদেরকে সান্ত্বনা, শিক্ষা ও উপদেশ প্রদানের জন্য, তাদের ইমান ও আমল সুদৃঢ় করার জন্য এবং ফিতনার সময় পূর্ববর্তীদের আদর্শের অনুকরণে তাদের করণীয় নির্দেশ করার জন্যই মূলত এ সুরাটি অবতীর্ণ হয়।


[1] তিনি ছিলেন উসায়দ ইবনু হুজায়র। [ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার]

[2] সহিহ বুখারি : ৫০১১ । সুরা কাহফের ফজিলত অধ্যায়।

[3] সহিহ মুসলিম : ২৯৩৭; সুনানু আবি দাউদ : ৪৩২১

[4] আল-মুসতাদরাক, ইমাম হাকিম : ২০৭২

[5] সহিহ মুসলিম : ৮০৯-৮১০

[6] আওনুল মাবুদ শারহু সুনানি আবি দাউদ

[7] সহিহ বুখারি : ৭৩৯২

[8] আন-নিহায়া ফি গারিবিল হাদিসি ওয়াল আসার : ১/৩৯৭

[9] মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার

[10] علم الجدل والمخاصمة: وهي المحاجة مع الفرق الأربع الباطلة، اليهود والنصارى والمشركين والمنافقين.

[11] আল-ফাউজুল কাবির, দারুস সাহওয়াহ কায়রো প্রকাশিত, পৃ. ৩১

[12] সুরা ইউসুফ : ১১১

[13] সুরা হুদ : ১২০

[14] সুরা আরাফ : ১৭৬

[15] সুরা আনফাল : ২৬

Share This