সহশিক্ষা অবশ্যই ক্ষতিকর এবং কোনো মুসলিম কখনো সহশিক্ষাকে সমর্থন করতে পারে না। একজন পুরুষের জন্য স্ত্রী এবং নিজের মাহরাম আত্মীয়া ছাড়া সকল নারীর থেকে দূরত্ব অবলম্বন করা একান্ত অপরিহার্য। তবে এ যুগে একটা সমস্যা ব্যাপকভাবেই চোখে ধরা পড়ছে। নারীদের থেকে আশৈশব এ দূরত্ব কোনো জাতির মধ্যে কেমন যেন আবার চেতনাকে ভিন্ন দিকে প্রয়োগ করছে। যা থেকে পরিমাণে স্বল্প হলেও সমকামিতার বিস্তার ঘটছে। এবং এই ব্যাধিটা আমরণ তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখছে। ফলে বিয়ের পরও অনেককে দেখা যায়, পুনরায় এ রোগের চর্চা করতে।

সহশিক্ষা, মেয়েদের সঙ্গে অবৈধ প্রেম, পর্ন দেখা, হস্তমৈথুন করা এগুলো সবগুলোই পাপ। এতে কারও দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু জঘন্যতার বিচারে সমকামিতার পাপ এরচে শুধু ভয়াবহই নয়; বরং মারাত্মক ভয়াবহ।

বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় কখনো পুরো সম্প্রদায়ের ওপর পড়ে না। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিমাণ যদি হয়ে দাঁড়ায় অনেক বেশি এবং তার বিস্তৃতি লক্ষ করা যায় দেশের সকল প্রান্তেই তখন বিষয়টা অবশ্যই উদ্বিগ্নের। এ বিষয়গুলো তখন আর রাখঢাক করে লুকিয়ে রাখার পর্যায়ে থাকে না; বরং প্রয়োজন হয় এসব নিয়ে জনসচেতনতার এবং সার্বিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের। তার পাশাপাশি যে জিনিসটি সবিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে, তা হলো, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং তাদের ওপর কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা। শুধু বহিষ্কারই যদি এর শাস্তি হয় তাহলে দুদিন পর অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তো এরা একই অপকর্মের বিস্তার ঘটাবে।

একটা জাতির মধ্যে বিচ্ছিন্ন অপরাধ ঘটলেই সবাই অপরাধী হয়ে যায় না। এক এলাকার দু-চারজন চোর বলে সবাইকে চোর ভাবা যায় না। কিন্তু কোনো জাতির মস্তিষ্কে বিকৃতি ঘটা দু-চারটা বিক্ষিপ্ত অপরাধের চাইতেও আরও বেশি উদ্বিগ্নের।

কোনো সুশ্রী বা নাদুসনুদুস একটা বালক ছেলে শিক্ষার জন্য দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েও কী এক লাঞ্ছনার মধ্যে দিনাতিপাত করে! সর্বদা টিটকারি, তাচ্ছিল্য! গায়ের বর্ণ সাদা হলেই ‘সুন্দরী’ অভিধা পাওয়া। সুযোগ পেলেই তাকে হেনস্তা করা। কখনো-বা প্রকাশ্যেই বিভিন্ন খারাপ অঙ্গভঙ্গি করা। পারলে দিনদুপুরে শরীরের বৈধ কোনো অংশে অন্যরকমভাবে হাতও দেওয়া।

এসব যদি নিত্যদিনের চিত্র হয় তাহলে একটা শুভ্র বর্ণের ছেলের মানসিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে কী হবে? সমকামিতার ব্যাধি আসলেই বিচ্ছিন্ন অবস্থা। শতে তার উদাহরণ সর্বোচ্চ ক’টাই হবে! কিন্তু এসব বিকৃত মানসিকতার চর্চার উদাহরণ তো বোধ হয় ভুরি ভুরি। যেগুলোকে সহজ ভাষায় ব্যক্ত করলে ‘যৌন নির্যাতন’ নামেই ব্যক্ত করতে হয়। না একটা ছোট বালক এগুলো সইতে পারে, না কাউকে বলতে পারে, না স্রোতের বিপরীতে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে! মুখ বুজে সব সয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে যারা আবাসিক থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এটাই এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ছোট ছেলেটা মানসিকভাবে বিকশিত না হয়ে ক্রমশ মিইয়ে যেতে থাকে। কখনো তার ভেতরেও ওসব বিপরীতমুখী চেতনা আশ্রয় গেঁড়ে নিতে থাকে। সে পৃথিবীর কাউকে বন্ধুরূপেও গ্রহণ করতে পারে না। কারও সঙ্গে মনের দুঃখগুলোও শেয়ার করতে পারে না। কারণ, তখন দেখা যাবে, বয়সে বড় কিছু কামুক বা বিকৃত মস্তিষ্কের ছেলেপেলে তাদের নিয়েই খারাপ কথা রটনা করে বসবে, তাদের বিচারের সম্মুখীন করবে এবং নিজের শয্যাসঙ্গী হিসেবে না পাওয়ার পুরো কষ্টটা এ উপায়ে ঝেড়ে প্রশান্তির শ্বাস নেবে। এভাবে একটা ছোট ছেলে বাবা-মা’র নিরাপদ কোল থেকে উঠে এসে কী ভয়াবহ যুদ্ধেই না আক্রান্ত হয়! আশৈশব জীবনযুদ্ধ। এসব যুদ্ধে কেউ টিকে যায়, কেউ বিরক্ত হয়ে সটকে পড়ে, আর কেউ-বা রণাঙ্গনে ভেটো দিয়ে ক্লান্ত দেহ নিয়ে একসময় নিজেই এসবের চর্চা শুরু করে।

নারীদের ক্ষেত্রেও অবস্থা কি এরচে ব্যতিক্রম? না, অবস্থা বরং এরচে ঢেরগুণ ভয়াবহ। একটা মেয়ে তার মনের কথাগুলো শেয়ার করার জন্য অবশ্যই একজন সঙ্গিনী, একজন বান্ধবীকে খোঁজবে। ছেলেরা একাকী থাকতে পারলেও মেয়েরা সঙ্গিনীহীনা কমই থাকতে পারে। ভেতরের কথাগুলো শেয়ার করতে না পারলে তারা চরম অস্বস্তিতে ভোগে। কিন্তু একটা মেয়ে জীবনের শুরুতে কিছু না বুঝেই যখন আরেকটা মেয়ের সঙ্গে গল্প করে, খেলাধুলা করে, তখন এই নিষ্কলুষ সম্পর্কের কারণেই কিনা তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। যে সমকামিতা চেনেই না, তাকে সেরেফ বিকৃতমস্তিষ্কের ধারণার ভিত্তিতে সমকামী ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। বাবা-মাকে ডেকে লজ্জিত করা হয়।

আগেই বলেছি, দু-একটা বিক্ষিপ্ত বা বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা যতটা না উদ্বিগ্নের; এগুলো তারচে অনেক বেশি উদ্বিগ্নের। শিক্ষার জন্য তাদের ওসব জায়গায় না পাঠিয়েও অনেকের জন্যই কোনো উপায় নেই। আর ওসব জায়গার চিত্র হলো এই। এ অবস্থায় একজন অভিভাবক কী সিদ্ধান্ত নেবে? সমকামিতার ব্যাধিগুলো নিয়ে অনেকে ভাবে, অনেকে বলে, অনেক প্রতিষ্ঠানে তা থেকে শতভাগ মুক্তও আছে; বিশেষ করে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু এসব সমস্যা নিয়ে না ছোট ছোট শিশুরা মুখ খোলে, না তাদের জন্য এগুলো মুখ খোলার মতো বিষয়, আর না এ নিয়ে কোনো জনসচেতনতার উদ্যোগ দেখা যায়!

আমরা কি আমাদের সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষার জন্য একটা নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিতে পারব না? আমি-আপনি কেউই কিন্তু এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির বাইরে না। আমরা আমাদের সন্তানদের অন্য কোনো গ্রহে পাঠিয়ে দিতে পারব না। তাদের মানুষ করার দায়িত্ব আমাদেরই। সুতরাং তাদের জন্য সুস্থ স্বাভাবিক নির্মল এক পৃথিবী গড়া এখন সময়ের দাবি।

জাতির কর্ণধাররাই যখন ব্যাপকভাবে বিকৃতমস্তিষ্ক হয়ে যাবে তখন সেই জাতির জন্য আগামীতে কী অপেক্ষা করছে, তা বলা সত্যি দুষ্কর।

Share This