অবাধ্য নারী – ১

নাশিজা নারীর বিধান সম্পর্কে সুরা নিসা’র ৩৪-৩৫ নম্বর আয়াতে আলোচনা এসেছে। নাশিজা মানে হলো অবাধ্য স্ত্রী। এই আয়াত দুটোর অধীনে তাফসিরগ্রন্থগুলোতে নাশিজা’র পরিচয় ও বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। নাশিজাকে সংশোধন করার ব্যাপারে প্রথম আয়াতে তিনটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো ধাপে ধাপে প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে। যদি এই তিনটি পরামর্শের কোনোটা কাজে লেগে যায় তাহলে আর তালাকের দিকে না যেতে নাসিহাহ দেওয়া হয়েছে। আর একান্ত যদি এর কোনোটিই কার্যকর না হয় তাহলে পরবর্তী আয়াতে নেক্সট করণীয় সম্পর্কে বলে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে হয়তো মিটমাট হবে কিংবা সম্পর্ক বিচ্ছিন্নতায় রূপ নেবে।

ইসলামে নারীদের জন্য বাবা-মা’র চেয়ে স্বামীর কথা মান্য করার গুরুত্ব বেশি। যদিও সমাজে এর চর্চা অনেক ফ্যামিলিতেই নেই। বরং স্বামীকে উল্টো বানানো হয় বাবা-মা’র হুকুমের বলির পাঠা। অথচ রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘আমি যদি কোনো মানুষকে অপর কাউকে সিজদা করার আদেশ দিতাম, তাহলে অবশ্যই নারীদের এই আদেশ দিতাম যে, তারা যেন তাদের স্বামীদের সিজদা করে। কোনো নারী তার ওপর থাকা আল্লাহর সকল হক আদায় করতে পারে না, যতক্ষণ না তার ওপর থাকা স্বামীর সকল হক আদায় করে।’ পুরো হাদিস এই –

لو كنتُ آمِرًا أحدًا أن يسجد لأحد، لأمرتُ المرأةَ أن تسجد لزوجها، ولا تؤدِّي المرأة حقَّ الله – عزَّ وجلَّ – عليها كلَّه، حتَّى تؤدِّي حق زوجها عليها كله، حتى لو سألها نفسها وهي على ظَهْر قتب، لأعطَتْها إياه

ইমাম আহমাদ রহ. বলেন,

المرأة إذا تزوَّجَت، كان زوجها أملك بها من أبويها، وطاعة زوجها عليها أوجب

কোনো নারী যখন বিয়ে করে তখন বাবা-মা’র চাইতে স্বামী তার ব্যাপারে অধিক কর্তৃত্ববান হয়ে যায়। এবং তার জন্য স্বামীর আনুগত্য করা অধিক অপরিহার্য।

অধিকাংশ আলিমের মতানুসারে শরয়ি কোনো ওজর না থাকলে কোনো স্ত্রীলোকের জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। তাদের এই মতের পক্ষে অনেক দলিল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ : ইবনু উমর রা. থেকে বর্ণিত বুখারি-মুসলিমের এই হাদিস –

إذا استأذنَكم نساؤكم باللَّيل إلى المسجد، فأْذَنوا لهن

রাতের বেলায় তোমাদের নারীরা তোমাদের কাছে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তোমরা অনুমতি দিয়ো।

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি রহ. বলেন,

واستُدِلَّ به على أنَّ المرأة لا تخرج من بيت زوجها إلاَّ بإذنه؛ لِتَوجُّهِ الأمر إلى الأزواج بالإذن

এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, স্ত্রীলোক স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বের হবে না। কারণ, এখানে অনুমতি প্রদানের বিষয়টি স্বামীদের দিকে ফেরানো হয়েছে। (অর্থাৎ তাদের অনুমতিসাপেক্ষেই কেবল নারীরা ঘরের বাইরে যেতে পারবে।)

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন,

لا يحلُّ للزوجة أن تخرج من بيتها إلاَّ بإذنه… وإذا خرجَتْ من بيت زوجها بغير إذنه كانت ناشزةً عاصية لله ورسوله، مستحِقَّة العقوبة

স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বের হওয়া বৈধ নয়।… যদি সে স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বের হয় তাহলে সে হবে নাশিজা, আল্লাহ এবং তার রাসুলের অবাধ্যতাকারিনী, শাস্তির উপযুক্ত।

ইমাম আহমাদ রহ.-এর এ কথাও উল্লেখ হয়েছে ‘শারহু মুনতাহাল ইরাদাহ’ গ্রন্থে (৩/৪৭),

طاعة زوجها أوجب عليها من أمها ، إلا أن يأذن لها

স্ত্রীলোকের জন্য মায়ের আনুগত্যের থেকে স্বামীর আনুগত্য অধিক আবশ্যক। হ্যাঁ, স্বামী যদি তাকে অনুমতি দেয় তাহলে ভিন্ন কথা।

উল্লেখ্য, একটা হলো অনুমতি দেওয়া, আর আরেকটা হলো জোর করে কিংবা ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে অনুমতি আদায় করা। অন্তরের সন্তুষ্টির সঙ্গে অনুমতি দিলে তো ঠিক আছে। আর অনুমতির পরোয়া না করলে বা জোরপূর্বক অনুমতি আদায় করলে তা হয় জুলুম। জুলুম কিয়ামতের দিন ঘুটঘুটে অন্ধকারে রূপ নেবে।

‘আলইনসাফ’-এ (৮/৩৬২) এসেছে,

لا يلزمها طاعة أبويها في فراق زوجها , ولا زيارةٍ ونحوها . بل طاعة زوجها أحق

স্বামীকে ছেড়ে থাকা কিংবা তাকে দেখতে না যাওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে বাবা-মা’র কথা মান্য করা নারীর জন্য অপরিহার্য নয়। বরং স্বামীর আনুগত্য তার ওপর সবচে বড় হক।

আললাজনাতুদ দায়িমার ফতোয়ায় এসেছে,

لا يجوز للمرأة الخروج من بيت زوجها إلا بإذنه ، لا لوالديها ولا لغيرهم ؛ لأن ذلك من حقوقه عليها ، إلا إذا كان هناك مسوغ شرعي يضطرها للخروج

নারীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বের হওয়া জায়িয নয়; বাবা-মা’র উদ্দেশ্যেও নয়, অন্য কারও উদ্দেশ্যেও নয়। কারণ, এটা তার ওপর স্বামীর হকের অন্তর্ভুক্ত। হ্যাঁ, যদি কোনো শরয়ি ব্যাপার থাকে, যা তাকে বের হতে বাধ্য করে, তাহলে ভিন্ন কথা।

সহিহ বুখারি এবং সহিহ মুসলিমের হাদিসে আয়িশা রা.-এর যে বাক্যটি এসেছে,

أتأذن لي أن آتي أبوي
আপনি কি আমাকে আব্বু-আম্মুর কাছে যাওয়ার অনুমতি দেবেন?

এর ব্যাখ্যায় ‘তারহুত তাসরিবে’ (৮/৫৮) ইরাকি রহ.-ও এ কথাই বলেন,

وقولها : أتأذن لي أن آتي أبوي : فيه أن الزوجة لا تذهب إلى بيت أبويها إلا بإذن زوجها ، بخلاف ذهابها لحاجة الإنسان فلا تحتاج فيه إلى إذنه ، كما وقع في هذا الحديث

স্ত্রী সে-ই হয়, যার মধ্যে মান্য করার যোগ্যতা থাকে। যে স্বামীর সিদ্ধান্তের সামনে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে না, সে রোগী। তার ইসলাহ প্রয়োজন। সে বাহ্যত অনেক জ্ঞানী বা নেককার হলেও আদতে সে অপরাধী, চরম অপরাধী। নারীদের জন্য স্বামীর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকালকার নারীরা এসব থোরাই কেয়ার করে। এগুলো যে দীনের অংশ, তা-ই বা কজন জানে!

ভালোবাসার সাগরে ডুব দিয়ে শরিয়তের বিধিবিধান আর কিছুই স্মরণ থাকে না। তখন সংসার চলে শরয়ি সীমারেখার ঊর্ধ্বে আরোহণ করে; মানবিক ভালোবাসার ভেলায় চড়ে। এমনও তো দেখা যায়, স্বামীর অনুমতির পরোয়া না করে, বরং স্বামীর সঙ্গে বিবাদ করে স্ত্রী কোনো ‘দীনি’ মেহনতে সময় দিতে শুরু করে। হিজবুত তাওহিদ নামক ভ্রান্ত দলের নারীদের অতীত-সমাচার জানলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে। স্বামীদের কথা মান্য করলে তাদের অধিকাংশেরই হয়তো আজ এভাবে দীন-দুনিয়া উভয়টাই হারাতে হতো না।

একমাত্র গোনাহের কাজে স্বামীর কথা মান্য করা যাবে না। এ ছাড়া সব ব্যাপারে তাকে মান্য করা অপরিহার্য; চাই তা মনমতো হোক বা না হোক। আজকাল মেয়েদের মধ্যে মানার গুণের থেকে মানানোর গুণটাই প্রবল। ফলে বাহ্যত যদিও পুরুষ সংসারের কর্তা; কিন্তু সেই পুরুষকেই বানিয়ে ফেলা হয় নিজের সেবকদাস; যার ওপর ভালোবাসার ছরি ঘুরিয়ে অবলীলায় শাসন চালিয়ে যায় কৌশলী নারীরা।

শয়তানের কৌশলের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘ইন্না কাইদাশ শাইতানি কানা দায়িফা।’ নিশ্চয়ই শয়তানের চক্রান্ত-কৌশল দুর্বল। আর নারীদের ব্যাপারে ইউসুফ আ.-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে, ‘ইন্না কাইদাকুন্না মাতিন।’ নিশ্চয়ই তোমাদের (নারীদের) চক্রান্ত-কৌশল শক্তিশালী।

 

অবাধ্য নারী – ২

 

রাসুলুল্লাহ সা. এক নারীকে বলেন,

فانظري أين أنت منه، فإنما هو جنتك ونارك

দেখো, স্বামীর কাছে তোমার অবস্থান কোথায়। নিশ্চয়ই স্বামীই তোমার জান্নাত এবং জাহান্নাম। (মুসনাদে আহমাদ)

অপর এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সা. তিন শ্রেণির হতভাগার কথা উল্লেখ করেন, যাদের সালাত তাদের শ্রবণেন্দ্রিয় অতিক্রম করে না; কবুল হওয়া তো দূরের কথা।

ثلاثة لا تجاوز صلاتهم آذانهم، العبد الآبق حتى يرجع، وامرأة باتت وزوجها عليها ساخط، وإمام قوم وهم له كارهون

এই তিন শ্রেণির হতভাগার মধ্যে এক শ্রেণি হলো এমন নারী, যে এমতাবস্থায় রাতযাপন করেছে যে, তার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট। (তিরমিজি)

আরেক হাদিসে এ-ও এসেছে,

إذا الرجل دعا زوجته لحاجته فلتأته، وإن كانت على التنور

স্বামী তার কোনো প্রয়োজনে স্ত্রীকে ডাকলে সে যেন তার কাছে চলে আসে; যদিও সে চুলায় থাকে। (তিরমিজি)

মুআজ রা.-এর হাদিসে এ কথা এসেছে,

لا تؤذي امرأة زوجها في الدنيا، إلا قالت زوجته من الحور العين: لا تؤذيه قاتلك الله، فإنما هو عندك دخيل، يوشك أن يفارقك إلينا.

কোনো নারী দুনিয়াতে তার স্বামীকে কষ্ট দিলে সেই স্বামীর জান্নাতি হুরে ঈন স্ত্রী তাকে উদ্দেশ্য করে বলে, তুই তাঁকে কষ্ট দিস না। আল্লাহ তোকে ধ্বংস করুন। তিনি তো তোর কাছে সাময়িক আগমনকারী। শীঘ্রই তিনি তোকে ছেড়ে আমাদের উদ্দেশ্য চলে আসবেন। (মুসনাদু আহমাদ, মুসতাদরাকে হাকিম, ইবনু মাজাহ, তাবারানি)

রাসুলুল্লাহ সা. বলেন,

أيما امرأة ماتت وزوجها راض عنها دخلت الجنة

যেকোনো নারী যদি এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, তার স্বামী তার ওপর সন্তুষ্ট, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিজি)

বিয়ের পর একজন নারীর ওপর তার স্বামীর হক সবচে বেশি। এমনকি মায়ের হকের ওপরও স্বামীর হক তখন অগ্রগণ্য হয়ে যায়। বাবা-মা’র সিদ্ধান্ত আর স্বামীর সিদ্ধান্ত বিরোধপূর্ণ হলে স্ত্রীর জন্য স্বামীর সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেওয়া অপরিহার্য হয়ে যায়। স্বামীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় একজন নারীর জাহান্নাম এবং জান্নাত। স্বামীর গুরুত্ব এত বলেই তো রাসুল বলেছেন, ‘আমি কোনো মানুষকে যদি অন্য কাউকে সিজদা করার আদেশ দিতাম, তাহলে নারীদের আদেশ দিতাম, তারা যেন নিজ স্বামীদের সিজদা করে। কারণ, যেহেতু আল্লাহ তাদের ওপর স্বামীদের জন্য অসংখ্য হক রেখেছেন।’ অর্থাৎ আল্লাহ এবং তার রাসুলের পর সকল বৈধ বিষয়ে স্বামীর সিদ্ধান্তের চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু কোনো নারীর জন্য হতে পারে না। সিজদা-সংক্রান্ত এমন কথা কিন্তু কোনো হাদিসে মায়ের ব্যাপারেও বলা হয়নি।

তিরমিজি এবং আবু দাউদের উপরিউক্ত বর্ণনাটি মুসনাদু আহমাদ গ্রন্থেও এসেছে। সেখানে শেষে এই অংশটি বর্ধিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. এ-ও বলেছেন,

والذي نفسي بيده لو كان من قدمه إلى مفرق رأسه قرحه تجري بالقيح والصديد ثم استقبله فلحسته ما أدت حقه

ওই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, যদি স্বামীর পা থেকে মাথার সিঁথি পর্যন্ত জখম থাকে, যেখান থেকে রক্ত-পূঁজ ঝড়তে থাকে, তারপর সে তার সামনে আসে, অনন্তর স্ত্রী তার এসব চেটে ফেলে, তবুও স্ত্রী তার হক আদায় করতে পারবে না।

সাহাবি জায়দ বিন সাবিত রা. সুরা ইউসুফের একটি আয়াতের আলোকে বলেন, স্বামী আল্লাহর কিতাবের বিধান অনুযায়ী নেতা।

الزوج سيِّدٌ في كتاب الله ، وقرأ قوله تعالى : ( وألفيا سيدها لدى الباب )

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন,

النكاح رق ، فلينظر أحدكم عند من يرق كريمته

বিয়ে হলো দাসত্ব। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন ভালো করে দেখে নেয়, কার কাছে নিজেদের সম্মানিত মেয়েকে দাসী বানাচ্ছে।

এখানে স্পষ্ট, উমর রা. মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার আগে ভেবেচিন্তে নিতে বলেছেন। কারণ, যেইমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে তখন থেকে তার সবকিছু হয়ে যাবে তার স্বামী। স্বামীই তার নেতা। স্বামীই তার দুনিয়া, স্বামীই তার আখিরাত। এমনকি বাবা-মা’র ধাপও চলে যাবে দ্বিতীয় স্তরে। স্বামীর হক ঠিক রাখার পর তাকে অন্যান্য হক সামাল দিতে হবে। এমনকি নারীর জান্নাতকেও স্বামীর আনুগত্যের সঙ্গে শর্তযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং বিয়ে না করলে তা আলাদা কথা। কিন্তু বিয়ে করে ফেললে সকল বৈধ বিষয়ে স্বামীর সিদ্ধান্তের নিজেকে সঁপে দিতে হবে। এমনকি বাবা-মা’কে পর্যন্ত স্বামীর ওপর প্রাধান্য দিতে গেলে তা হবে জুলুম এবং হতভাগ্যের কারণ। পাশাপাশি এ নারীর নসিবে জুটবে নিষ্পাপ জান্নাতি হুরে ঈনদের বদদুয়া।

ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন,

فالمرأة عند زوجها تشبه الرقيق ، والأسير ، فليس لها أن تخرج من منزله إلا بإذنه ، سواء أمرها أبوها ، أو أمها ، أو غير أبويها ، باتفاق الأئمة .

নারী তার স্বামীর কাছ দাসী এবং বন্দীসদৃশ। সুতরাং স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বের হওয়া বৈধ নয়; এমনকি যদি তার বাবা কিংবা মা কিংবা এ ছাড়া অন্য কেউ তাকে বের হতে আদেশ করে, তবুও। এটা ইমামগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।

এমনকি কোনো স্বামী যদি সঠিকভাবে স্ত্রীর ভরণপোষণ দেয় এবং আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা ঠিক রাখে, আর কোনো কারণে সে স্ত্রীকে নিয়ে অন্য কোনো এলাকায় চলে যেতে চায়; কিন্তু স্ত্রীর বাবা-মা এতে বাধ সাধে, তাহলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বাবা-মা জালিম। স্ত্রীর জন্য এ ব্যাপারে বাবা-মা’র নির্দেশ মান্য করা বৈধ নয়। বরং তার ওপর তা-ই অপরিহার্য, যা তার স্বামীর সিদ্ধান্ত। হ্যাঁ, স্বামী যদি স্বেচ্ছায় তাকে এখানে থাকার অনুমতি দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা।

আজকাল তো অনেক বাবা-মা এসব ব্যাপারে বেশ বাড়াবাড়ি করে। বিয়ের পরও মেয়ের ওপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে রাখে, যেখানে জামাইয়ের মতামত হয়ে যায় গৌণ। এসব বাবা-মা বাহ্যত দীনদার হলেও আদতে তারা জালিম। আর জুলুম কিয়ামতের দিন গভীর অন্ধকারে রূপ নেবে।

সাধারণত এ ধরনের বাবা-মা’র সঙ্গে জামাইদের অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকে। সর্বাবস্থায় তা প্রকাশিত হয় না। কোথাও বা প্রকাশিত হলে সংসার ভাঙন পর্যন্ত গড়ায়। এ ক্ষেত্রে কখনো-বা স্ত্রীরা বাবা-মা’র পক্ষ নিয়ে স্বামীর কাছে তালাক পর্যন্ত চেয়ে বসে; যেহেতু স্বামী বেচারা তার বাবা-মা’র নির্দেশমতো বা মনমতো চলে না। এমন নারীর ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে,

أيما امرأة سألت زوجها الطلاق غير ما بأس فحرام عليها رائحة الجنة

যে নারী কোনো (শরয়ি) সমস্যা ছাড়া স্বামীর কাছে তালাক চাবে, তার ওপর জান্নাতের ঘ্রাণও হারাম।

এমনকি এ ধরনের নারীদের মুনাফিক আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে,

المختلعات والمتبرعات هن المنافقات

এ ব্যাপারগুলো নিয়ে ইমাম ইবনু তাইমিয়া তার ‘মাজমুউল ফাতাওয়া’ গ্রন্থে (৩২/২৬১-২৬৪) বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।

ইমাম ইবনু হাজার হাইতামি নারীদের আনুগত্যের বয়ান প্রসঙ্গে হামাওয়ির হাওয়ালায় এ-ও বলেছেন,

لا لعيادة مريض وإن كان أباها، ولا لموته وشهود جنازته، قاله الحموي.

কোনো অসুস্থ রোগীকে দেখার জন্যও নারী তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া বের হতে পারবে না; যদিও অসুস্থ রোগী যদি হয় তার বাবা। অনুরূপ বাবার মৃত্যু উপলক্ষে বা তার জানাযায় উপস্থিত হওয়ার উদ্দেশ্যেও স্বামীর অনুমতি ছাড়া বেরোতে পারবে না।

ইবনু কুদামা রহ. ‘আলমুগনি’ গ্রন্থেও অনুরূপ কথা বলেছেন,

وللزوج منعها من الخروج من منزله، إلى ما لها منه بد، سواء أرادت زيارة والديها، أو عيادتهما، أو حضور جنازة أحدهما

বিগত পোস্টে আমরা এ-সংক্রান্ত ইমামগণের আরও অনেকগুলো উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছি।

আজকালকার নারীরা এবং তাদের বাবা-মা’রা এসবের থোরাই কেয়ার করে। স্বামীরা বিয়ের পরও খুব স্বল্প পরিমাণেই স্বাধীনতা ভোগ করে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর ঐকমত্য থাকার পরও শ্বশুর-শাশুড়ির চাপে অনেক উপকারী এবং বৈধ কাজ থেকে পর্যন্ত তাদের দূরে থাকতে হয়। এমন বাবা-মা’রা মেয়েদের বিয়ে না দিলেই পারে। কিন্তু বিয়ে দেওয়ার পর এভাবে নেক সুরতে জালিমরূপে আবির্ভূত হয়ে নিজেদের আখেরাত বরবাদ করা অর্থহীন। জান্নাতি হুররা দুনিয়ার স্ত্রীদের কার্যাবলি খুব ভালো করে ফলো করে। তাদের গাফিলতি এবং অনাচার দেখলে অভিসম্পাতও করে। স্ত্রীর ক্ষেত্রেই যদি এই কথা হয়; তাহলে থার্ড পারসন, অর্থাৎ স্ত্রীর বাবা-মা’র বিষয়টি কেমন হবে।

 

অবাধ্য নারী – ৩

 

দুনিয়ার মধ্যে একজন মানুষ যতকিছু পায় এবং ভোগ করে, হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী তার মধ্যে সবচে উত্তম হলো সৎ নারী। একজন ভালো স্ত্রীর সংজ্ঞা যদি নির্ধারণ করা হয়, তাহলে প্রথমেই যে বিষয়টি আসবে, তা হলো স্বামীর আনুগত্য। নারীর যদি এতে কমতি থাকে, তাহলে প্রথম ধাপেই সে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাবে। ইহকাল এবং পরকাল উভয় জগতেই সে হতভাগা। যদি এমন হয়, তারা বাবা-মা তার ওপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট; কিন্তু তার বেপরোয়া ভাব বা অবাধ্যতার কারণে স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট, তাহলে বাবা-মা’র সন্তুষ্টি থাকার পরও সে চির হতভাগা। এই বৈবাহিক জীবনের ব্যর্থতা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে; এমনি সে যতই নামাজ-রোজা করুক না কেন।

কোনো নারী যদি অবাধ্য হয়, পরিভাষা অনুসারে তাকে নাশিজা বলা হয়। অবাধ্যতার অনেক সুরত রয়েছে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোথাও চলে যাওয়াও অবাধ্যতার মধ্যে পড়ে। স্বামীর অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও বাবার বাড়িতে পড়ে থাকাও অবাধ্যতার মধ্যে পড়ে। কোন বিষয়টি কতটুকু পর্যায়ে গেলে শরিয়তের দৃষ্টিতে অবাধ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তার ভিত্তিতে কোনো নারীকে নাশিজা বলা যায়, তা দীর্ঘ আলোচনাসাপেক্ষ। স্বামীর জন্য নাশিজা নারীর ভরণপোষণ দেওয়াও অপরিহার্য নয়। তার ব্যাপারে স্বামীর করণীয় সম্পর্কে সুরা নিসা’র ৩৪-৩৫ নম্বর আয়াতে আলোচনা এসেছে।

আজ আমাদের আলোচ্যবিষয় হলো, বিয়েতে স্ত্রী বা তার ফ্যামিলির পক্ষ থেকে স্বামীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া শর্ত সম্পর্কে। স্বামীর জন্য সেই শর্তগুলো মান্য করা অপরিহার্য কি না, যেকোনো শর্ত বিয়ের সময় উল্লেখ করলেই কি তা অবধারিত হয়ে যায় ইত্যাদি। আমরা এ বিষয়টি নিয়ে হানাফি মাজহাবের আলোকে আলোচনা করব। তবে এর অনেকগুলো বিষয়ই এমন, যে ক্ষেত্রে অন্যান্য মাজহাবও একমত। বিয়েতে করা শর্তের ব্যাপারে হাম্বলি মাজহাবে শুধু তুলনামূলক বেশিই ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে; যা আমাদের মাজহাবের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আজকের পোস্টে সে প্রসঙ্গে আলোচনা হবে না। কারও যদি সে ব্যাপারে জানার থাকে, তাহলে পরবর্তী কোনো পোস্টে আলোচনা হতে পারে।

বিয়েতে করা শর্ত প্রসঙ্গে প্রথমে কয়েকটি কথা স্মরণ রাখতে হবে।

১. বিয়েতে করা শর্তগুলো মৌলিকভাবে দুপ্রকার : (ক.) সহিহ শর্ত এবং (খ.) বাতিল বা ফাসিদ শর্ত।

২. ক্রয়-বিক্রয়ে শর্ত বাতিল হলে মূল চুক্তিই বাতিল হয়ে যায়। এরপরও বিকিকিনি করতে চাইলে সেই শর্তকে বাদ দিয়ে নতুন করে চুক্তি নবায়ন করতে হয়। পক্ষান্তরে বিয়েতে বাতিল বা ফাসিদ শর্ত যোগ করা হলে বিয়ে বাতিল হয়ে যায় না। বরং সেই শর্তগুলো আপনাআপনি বাতিল হয়ে যায়।

একটি বাতিল শর্তের আলোচনা প্রসঙ্গে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. তার ‘কিতাবুল হুজ্জাহ’ গ্রন্থে বলেন,

النِّكَاح فِي ذَلِك جَائِز وَالشّرط بَاطِل
এ ক্ষেত্রে বিয়ে বৈধ আর শর্ত বাতিল।

৩. যে ক্ষেত্রে শর্ত মান্য করা অপরিহার্য থাকে, সে ক্ষেত্রেও যদি স্বামী তা মান্য না করে, তবে এ কারণে সে গোনাহগার হবে; কিন্তু হানাফি মাজহাবের সিদ্ধান্তমতে এই অমান্যতার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিয়ে ভেঙে যাবে না বা স্ত্রী চাইলেই বিয়ে ভেঙে দিতে পারবে না। এর দায়ভার স্বামীর কাঁধে থাকবে। আল্লাহর কাছে সে অপরাধী থাকবে। তবে এ কারণে সংসার ভাঙার পর্যায়ে যাবে না।

فوات الشرط يوجب فوات الرضا، وفوات الرضا لا اثر له في النكاح.

হ্যাঁ, যদি এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সাংসারিক হকগুলো অনাদায়ী থাকে বা স্ত্রী তার প্রাপ্য হক থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে স্ত্রী প্রমাণসাপেক্ষে ইসলামি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে বা সালিসের মাধ্যমে মিটমাট করে নিতে পারে।

এবার আসি মূলকথায়।

বিয়েতে যে শর্তগুলো করা হয়, সেগুলো প্রধানত দুপ্রকার; যেমনটা আমরা ওপরে বলে এসেছি। (১) সহিহ শর্ত; (২) বাতিল বা ফাসিদ শর্ত। প্রথম প্রকারটি তথা সহিহ হলো চার ধরনের শর্ত। এর বাইরে যা কিছু আছে, সবই ফাসিদ এবং বাতিল। সুতরাং যদি বিয়েতে করা শর্তগুলো, তা যে পক্ষের থেকেই হোক না কেন, এই চার প্রকারের কোনোটির মধ্যে পড়ে, তাহলে তা মান্য করা ওয়াজিব। আর যদি এই চারওটির কোনোটির মধ্যে না পড়ে, তাহলে তা মান্য করার কোনো অপরিহার্যতা নেই; এমনকি নিজে নিজের ওপর অপরিহার্য করে নিলেও অপরিহার্য হবে না।

সহিহ শর্তের প্রকার :

১. এমন সব শর্ত, যা বৈবাহিক চুক্তির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদি তা উল্লেখ না-ও করা হয়, তবুও বৈবাহিক চুক্তির দাবিতেই তা অপরিহার্য থাকে। উদাহরণস্বরূপ : মেয়েপক্ষ শর্ত করল, মেয়েকে ঠিকমতো ভরণপোষণ দিতে হবে, তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে, তার মোহর পরিশোধ করতে হবে ইত্যাদি। কিংবা স্বামী শর্ত করল যে, তার ঘরে থাকতে হবে, তার সেবা করতে হবে, তার কথা শুনতে হবে, তার অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বেরোবে না, তার উপস্থিতিতে তার অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখবে না ইত্যাদি। তো এসব শর্ত যদি আলাদাভাবে উল্লেখ না-ও করা হতো, তবুও বৈবাহিক চুক্তির দাবি হিসেবেই এগুলো তাদের ওপর অপরিহার্য থাকত।

সকল মাযহাবের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো, এ প্রকারের শর্ত মান্য করা অপরিহার্য। কারণ, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন,

أَحَقُّ الشُّرُوطِ أَنْ تُوفُوا بِهِ : مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوج
শর্তসমূহের মধ্যে যা পূর্ণ করার সর্বাধিক দাবি রাখে, তা হলো সেই শর্ত, যার মাধ্যমে তোমরা স্ত্রীদের হালাল করেছ। (বুখারি : ২৭২১; মুসলিম : ১৪১৮)

২. বৈবাহিক চুক্তির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক শর্তসমূহ, যেগুলো মূলত বৈবাহিক চুক্তিকে সুদৃঢ় করে এবং বিয়ের দাবিসমূহকে শক্তিশালী করে। তো এ প্রকারের শর্ত বৈবাহিক চুক্তির মাধ্যমেই অবধারিত হয়ে যাওয়ার ছিল না, আবার এগুলো আরোপ করা বৈবাহিক সম্পর্কের খেলাফ কোনো কিছুও অপরিহার্য করে না; তবে এগুলোকে অতিরিক্তভাবে আরোপ করার দ্বারা যেকোনো পক্ষ বিয়ের কোনো দাবি পূরণের ব্যাপারে অধিক আশ্বস্ত হতে পারে এবং যার ফলে এতে উভয় পক্ষেরই কল্যাণ নিহিত থাকে। উদাহরণস্বরূপ : স্ত্রী শর্তারোপ করল, একান্ত স্বামী যদি মোহর পরিশোধ না করে, তবুও যেন মোহর অনাদায়ী না থেকে যায়, এ জন্য তৃতীয় কাউকে এই আর্থিক দায়ের দায়িত্ব নিতে হবে কিংবা এমন শর্ত আরোপ করল যে, স্বামীর বিকল্প হিসেবে শ্বশুরকে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হবে ইত্যাদি।

সকল মাজহাবের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ প্রকার শর্তও সহিহ এবং গ্রহণীয়। এ ধরনের শর্ত মান্য করাও অপরিহার্য।

৩. এমন শর্ত, বৈবাহিক জীবনে শরিয়ত যার বৈধতা দিয়েছে এবং তার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপকে অপরিহার্য করেছে; যদিও তা সরাসরি বৈবাহিক চুক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত কিংবা বিয়ের দাবিকে সুদৃঢ়কারী না হয়। উদাহরণস্বরূপ : স্বামী শর্তারোপ করল, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কিংবা অন্য যেকোনো কারণে আমি এখনই মোহর পরিশোধ না করে অমুক সময়ে করব।

এ প্রকার শর্তের ব্যাপারে পূর্বের মতোই সকল মাযহাবের ঐকমত্য রয়েছে।

৪. বিয়ে-সংক্রান্ত এমন সব শর্ত, যেগুলো মুসলিম সমাজে প্রচলিত; যদিও তা সরাসরি বৈবাহিক চুক্তির দাবি কিংবা তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয়, আবার তার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর নুসুসে কোনো নির্দেশও আসেনি। তবে তা শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

হানাফি মাজহাবের স্বকীয়তা হলো, তারা এ ধরনের শর্তকেও বিবেচনায় নেন এবং এটাকেও সহিহ শর্তের অন্তর্ভুক্ত করেন। এ ক্ষেত্রে তাদের উসুল হলো একটা ফিকহি মূলনীতি,

الثابت بالعرف كالثابت بالنص.

এই চার প্রকার শর্ত হলো সহিহ শর্ত। উপরিউক্ত হাদিসের কারণে এ চারও প্রকারের শর্ত মান্য করা অপরিহার্য।

কোনো শর্ত যদি এমন হয় যে, তা বৈবাহিক চুক্তির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ও সাংঘর্ষিক কিংবা সে ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহয় স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে, তা হলে এমন শর্ত সব মাজহাবের ফতোয়ামতেই বাতিল।

উদাহরণস্বরূপ : স্বামী বিয়েতে শর্তারোপ করল,
* আমি তোমাকে বিয়ে করছি এ জন্য যে, তোমার আগের স্বামী, যে তোমাকে তিন তালাক দিয়েছে, তার জন্য যেন তুমি হালাল হয়ে যাও।
* আমি তোমাকে বিয়ে করেছি এ জন্য যে, যেন তুমি তোমার নিজের ওপর তালাক প্রয়োগ করো কিংবা তালাকের অধিকার তোমার হাতে থাকে। (উল্লেখ্য, এই শর্ত যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে হয়, তাহলে তা অপরিহার্য হয়ে যায়। কিন্তু স্বামী নিজের পক্ষ থেকে বিয়ের সঙ্গে এই শর্ত যোগ করতে পারে না। প্রকাশ থাকে যে, একটা হলো চুক্তির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে শর্তারোপ আর আরেকটা হলো অধিকার প্রদান, দুটো কিন্তু এক কথা নয়। তাই ভুল বোঝার কারণ নেই।)
* তোমাকে বিয়ে করলাম এই শর্তে যে, তোমাকে কোনো মোহর দেবো না বা তোমার ভরণপোষণ দেবো না কিংবা স্ত্রী বলল, শর্ত হলো, তুমি আমাকে কোনো ভরণপোষণ দেবে না ইত্যাদি।
* স্বামী শর্তারোপ করল, তুমি উপার্জন করে আমাকে খাওয়াতে হবে।
* কিংবা শর্ত হলো, আমি তোমার সতিনের সঙ্গে অধিক রাত থাকব আরর তোমার সঙ্গে কম রাত থাকব, তোমাকে এটা মেনে নিতে হবে।
* স্ত্রী শর্ত করল, আমি তোমার কথা মানব না কিংবা অনুমতি ছাড়াই যখনতখন তোমার ঘর থেকে বেরোব অথবা আমার আগের ঘরের বাচ্চাকাচ্চার দেখভাল তোমাকে করতে হবে ইত্যাদি।
* স্বামী এই শর্ত আরোপ করল যে, আমি তিনদিন বা একদিন তার সঙ্গে থাকব। ভালো লাগলে বিয়ে কার্যকর হবে। অন্যথায় বাতিল হয়ে যাবে। অথবা বলল, আমি তো তার দেহ দেখিনি। তাই দেখার শর্ত থাকল। কুমারী হলে বিয়ে কার্যকর থাকবে; অন্যথায় নয়। কিংবা বলল, মেয়ে নিখুঁত থাকতে হবে। যদি কোনো খুঁত পাই, তাহলে হবে না ইত্যাদি। ইমাম সারাখসি রহ. তার ‘আলমাবসুত’ গ্রন্থে বলেন,
وكذلك إن اشترط أحدهما على صاحبه السلامة من العمى والشلل ، والزمانة فوجد بخلاف ذلك لا يثبت له الخيار ، وكذلك لو شرط الجمال والبكارة ، فوجدها بخلاف ذلك لا يثبت له الخيار ; لأن فوت زيادة مشروطة بمنزلة العيب في إثبات الخيار كما في البيع ، وبهذا تبين أنه لا معتبر لتمام الرضا في باب النكاح فإنه لو تزوجها بشرط أنها بكر شابة جميلة فوجدها ثيبا عجوزا شوهاء لها شق مائل وعقل زائل ولعاب سائل ، فإنه لا يثبت له الخيار ، وقد انعدم الرضا منه بهذه الصفة .
* স্ত্রী শর্ত দিলো, আমাকে বিয়ে করার জন্য তোমার আগের স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে। এর নিষিদ্ধতা তো সহিহ বুখারির ২৭২৩ নম্বর হাদিসেই বর্ণিত হয়েছে।

এবার আমরা আসি হানাফি মাজহাবের দৃষ্টিতে বাতিল ও ফাসিদ শর্তের আলোচনায়। আমরা আগেই বলেছি, উপরিউক্ত চারও প্রকারের বাইরে যত শর্ত হতে পারে, হানাফি মাজহাবের দৃষ্টিতে তা সবই বাতিল। অর্থাৎ বিয়ে হয়ে যাবে ঠিকই; কিন্তু শর্তগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রহিত হয়ে যাবে। এর দুটোর আলোচনাও আবার ওপরে চলে গেছে। অর্থাৎ
* যা বৈবাহিক চুক্তির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ও সাংঘর্ষিক।
* কুরআন-সুন্নাহর নুসুসেই যে সকল শর্তকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়াও যে সকল শর্ত না বৈবাহিক চুক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, আর না তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক, না শরিয়ত তার বৈধতা দিয়েছে, আর না মুসলিম সমাজে তার সাধারণ প্রচলন রয়েছে এবং এর পাশাপাশি তাতে স্বামী-স্ত্রী কিংবা তৃতীয় কোনো হকদার ব্যক্তির উপকার রয়েছে এমন সব শর্তই বাতিল।

কেন?

কারণ, বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন,

مَنْ اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ : فَلَيْسَ لَهُ ، وَإِنْ اشْتَرَطَ مِائَةَ شَرْطٍ
যে ব্যক্তি এমন কোনো শর্ত করল, যা আল্লাহর কিতাবে নেই, তা তার জন্য সাব্যস্ত হবে না; যদিও সে এক শ শর্ত করে।

হাফিজ ইবনু হাজার রহ. ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে (৫/১৮৮) বলেন,

المراد بما ليس في كتاب الله : ما خالف كتاب الله
‘আল্লাহর কিতাবে নেই’ হাদিসের এই কথার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যা আল্লাহর কিতাবের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ সা. আরও বলেন,

الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ ، إِلَّا شَرْطًا حَرَّمَ حَلَالًا ، أَوْ أَحَلَّ حَرَامًا
মুসলমানরা তাদের শর্তের ওপর থাকবে; তবে এমন শর্ত বাদে, যা কোনো বৈধ কাজকে নিষিদ্ধ করে দেয়, কিংবা কোনো নিষিদ্ধ কাজকে বৈধ করে দেয়। (তিরমিজি : ১৩৫২; আবু দাউদ : ৩৫৯৪)

সুতরাং কোনো নারী যদি বিয়েতে শর্তারোপ করে,
* আমাকে আমার বাবার বাড়িতেই রাখতে হবে;
* আমাকে আমার জেলাশহরেই রাখতে হবে;
* আমি জীবিত থাকাকালে আর কোনো মেয়েকে বিয়ে করা যাবে না;
* বিয়ের পর আমাকে ডাক্তারি শেষ করাতে হবে কিংবা দীনি অথবা দুনিয়াবি অমুক পড়ালেখা করাতে হবে

এসব শর্ত বাতিল হয়ে যাবে এবং বিয়ে তার স্বাভাবিক অবস্থায় কার্যকর থাকবে। তো যেহেতু এই শর্তগুলো কার্যকরই হয়নি, তাই স্ত্রীপক্ষও স্বামীর ওপর এসব ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না। স্ত্রী যদি এখন স্বামীর স্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি না নেয়, এমনকি তার তোয়াক্কা না করে স্বউদ্যোগে কিংবা শ্বশুর-শাশুড়ির পরামর্শে তার শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখে কিংবা বাবা-মা’র ভালোবাসায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বা অন্য কোনো কারণে স্বামীর স্বতস্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি ব্যতিরেকেই বাবার বাড়িতে থাকতে থাকে তাহলে সে-ও হবে (নাশিজা) অবাধ্য। নাশিজার বিধান তার ওপর পুরোপুরিই প্রযোজ্য হবে। এমন নারীর দুনিয়া-আখিরাত উভয়টাই ধ্বংসের মুখে।

অন্য কোনো নারীকে বিয়ে না করার শর্ত প্রসঙ্গে ইমাম সারাখসি রহ. তার ‘আলমাবসুত’ গ্রন্থে বলেন,

والوفاء بهذا الشرط لا يلزمه, كما لو التزمه بنفسه

এই শর্ত মান্য করা তার ওপর আবশ্যক নয়। এমনকি সে নিজে নিজের ওপর আবশ্যক করে নিলেও তা আবশ্যক হবে না।

সুতরাং বিয়ের সময় যদি স্ত্রীকে পড়ানোর শর্ত থেকেও থাকে, (আর তা এমন শর্ত, যা বৈবাহিক চুক্তির অন্তর্ভুক্ত কিংবা তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কিছু নয়, আবার তার সঙ্গে বিরোধপূর্ণও নয়, এটা হলো সাধারণ উপকারী শর্ত, যাতে খোদ স্ত্রীরই উপকার রয়েছে।) তবুও হানাফি মাজহাবের সিদ্ধান্ত অনুসারে স্বামীর জন্য তা মান্য করা অপরিহার্য নয়। এমনকি যদি নিজের ওপর সেই শর্তকে অপরিহার্য করে নেয়, তবুও তা অপরিহার্য হবে না। তবে যদি শর্ত পালন হিসেবে নয়; বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বামী এর অনুমতি দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা। অন্যথায় স্ত্রী যদি নতুন করে তার স্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি না নিয়ে এ পথে পা বাড়ায়, তাহলে সে-ও নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ততার মধ্যে ফেলল। এখানে শুধু বাবা-মা কেন, পুরো পৃথিবী অনুমতি দিয়ে দিলেও তার কাজে আসবে না। তার নাম চলে যাবে নাশিজার তালিকায়।

 

অবাধ্য নারী – ৪

 

যেকোনো মানুষ কোনো অন্যায় কর্মে দুভাবে লিপ্ত হয় : কখনো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তাতে লিপ্ত হয়। আর কখনো কারও পরামর্শে বা প্ররোচনায় তাতে লিপ্ত হয়। একজন নারী অবাধ্যতা করার পেছনেও এ দুটোর কোনো একটি কারণ কার্যকর থাকতে পারে। আমরা সমাজবাসীরা অবাধ্যতাকে যত সীমিত অর্থে বুঝে থাকি, এই সিরিজের পূর্বের লেখাগুলো যারা পড়েছেন, তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা, শরিয়তে অবাধ্যতার অর্থ ততটা সীমিয় নয়; বরং তারচে বেশ ব্যাপক।

নারীরা স্বভাবগতভাবে বাবাকে বেশি ভালোবাসলেও সাধারণত মা’র সঙ্গেই অধিক ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকে। বিষয়টা যৌক্তিকও বটে। বয়ঃসন্ধিকাল থেকে শুরু করে সন্তান হওয়া পর্যন্ত জীবনের অনেক কঠিন কঠিন ধাপে মা’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে। মেয়েরা তাই খুব সহজেই মা’র আদর্শে প্রভাবিত হয়। মা’র দীনদারি কিংবা দুনিয়াদারি সবকিছুর ছোঁয়া মেয়েদের ওপর ভালোই পড়ে। মা’রা নামাজি-রোজাদার হলেও সাংসারিক অবাধ্যতার বিস্তর পরিধি সম্পর্কে তাদের অনেকেই থাকে বেখবর। হয়তো ফাজায়েল আমাল, হেকায়াতে সাহাবা বা এ ধরনের কোনো গ্রন্থ আদ্যোপান্ত মুখস্থ থাকলেও সংসারজীবনের অভ্যন্তরীণ মাসায়িল সম্পর্কে সাধারণভাবে খুব কম মা’রাই জ্ঞানী থাকেন। যারা জ্ঞানী থাকেন, তাদের সবার মধ্যেও মানার বৈশিষ্ট্য সমান থাকে না। তাই মা যদি সচেতন না হন, তাহলে এই পরম মমতাময়ী এক মা’ই অজ্ঞাতসারে বিষিয়ে তুলতে পারে মেয়ের সাংসারিক জীবন, তাকে করে তুলতে পারে স্বামীর অবাধ্য। আর যারা দীনদার না, তাদের ক্ষেত্রে এমনটা তো অনেকই ঘটে থাকে।

মেয়েরা অবাধ্য হয়ে ওঠার পেছনে কখনো নিজস্ব তৎপরতা থাকে, কখনো থাকে দুষ্ট মা’দের প্ররোচনা বা দীনদার মা’র ভুল সিদ্ধান্ত/পরামর্শ, কখনো থাকে ভাই-বোন কিংবা ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর ওয়াসওয়াসা। এককথায় একজন নারীর অবাধ্য হয়ে ওঠার পেছনে কিংবা কোনো ক্ষেত্রে অবাধ্যতা করার পেছনে অনেক ধরনের কার্যকারণই বিদ্যমান থাকতে পারে। সবসময়ই তা শুধু নফস ও শয়তানের ধোঁকায় হয় না; কখনো তা কোনো আত্মীয় বা অনাত্মীয়, ঘনিষ্ঠ মানব-মানবীর প্ররোচনায় কিংবা ভুল পরামর্শেও হতে পারে। আর এ কারণেই তো বলা হয়েছে,

اطلبوا الجار قبل الدار.
ঘর খোঁজার আগে প্রতিবেশী খোঁজো।

সুতরাং সংসার সুখের হওয়ার জন্য শুধু স্ত্রী মনমতো হলেই হয় না; তার ফ্যামিলি এবং সার্কেলও প্রকৃত অর্থে ভালো হতে হয়। নইলে সব ঠিক থাকার পরও অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়।

এসব অনিষ্টের একটা সূত্র হলো, মেয়েরা সাংসারিক অনেক অভ্যন্তরীণ ব্যাপারও মা, বোন কিংবা বান্ধবীর সঙ্গে আলোচনা করে। দুজনার সংসারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারগুলো দুজনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এগুলো বাইরে আলোচনা করার বিষয় নয়। আজকালকার মেয়েরা অন্যান্য অভ্যন্তরীণ বিষয় তো আলোচনা করেই, অনেকে তো সেক্সের বিষয়গুলোও স্পষ্টভাবে বা আকার-ইঙ্গিতে অন্যদের সামনে তুলে ধরে। ফলে কখনো এমনও হয় যে, তার মুখে তার স্বামীর বিভিন্ন বর্ণনা শুনে পরনারী তার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। যেগুলো কখনো জাদু করা, কখনো নজর দেওয়া আর কখনো-বা পরকীয়া পর্যন্তও গড়ায়। আর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আত্মীয়-অনাত্মীয় বহিরাগতদের পরামর্শ ঢালাওভাবে গ্রহণের ধারা তো অব্যাহত থাকেই।

মায়ের জন্যও কোনো অবস্থায় উচিত নয় মেয়ের সংসারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো। মেয়েকে এই-সেই পরামর্শ দিয়ে নাশিজায় পরিণত করা তো চরম পর্যায়ের গোনাহ। স্বামীর অজান্তে বা অনুমতি ছাড়াও মেয়েকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসা, তার সন্তুষ্টি ছাড়া মেয়েকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাড়িতে রেখে দেওয়া, মেয়ের সংসারজীবনে বিভিন্ন বাতিল বা ফাসিদ শর্ত জুড়ে দেওয়া, স্বামীকে না জানিয়েই মেয়েকে কোনো কাজে লাগিয়ে দেওয়া, উদাহরণস্বরূপ : তার অজ্ঞাতসারেই তাকে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা কিংবা তাকে কোনো জবে লাগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। মা তিনি মা হতে পারেন, তবে তার খেয়াল রাখা উচিত উমর রা.-এর সেই ঐতিহাসিক বাণী :

النكاح رق ، فلينظر أحدكم عند من يرق كريمته

বিয়ে হলো দাসত্ব। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন ভালো করে দেখে নেয়, কার কাছে নিজেদের সম্মানিত মেয়েক্র দাসী বানাচ্ছে।

সুতরাং মেয়ে যার কাছে দাসীসদৃশ রয়েছে, তার অনুমতি ছাড়া কিংবা তার থেকে আগ বেড়ে নিজের থেকে কোনো পণ্ডিতি করা মা’দের জন্য কখনোই শোভনীয় নয়। মেয়ের সংসার মেয়েকেই করতে দেওয়া উচিত। মেয়ে তো ছোট মানুষ, এ অজুহাত দেখিয়ে তার সংসারে নিজের নাক গলানো উভয়ের জন্যই ধ্বংসের কারণ। মুসনাদু আহমাদ গ্রন্থে এক সহিহ হাদিসে এসেছে,

من أفسد امرأة على زوجها فليس منا
যে কোনো নারীকে তার স্বামীর ওপর বিশৃঙ্খল করে দেয়, সে আমাদের (অর্থাৎ মুসলিমদের) অন্তর্ভুক্ত নয়।

‘যে’ কথাটা ব্যাপক। এই ‘যে’ হতে পারে মা-বাবা, হতে পারে ভাই-বোন, আবার হতে পারে কোনো অনাত্মীয় বান্ধবী বা ঘনিষ্ঠজন। যে-কেউই এমনটা করুক না কেন, সে নিজেকে মুসলিম পরিচয় দেওয়ার যোগ্যতাই হারিয়ে ফেলে। এটা কত ভয়াবহ গোনাহ হলে রাসুল সা. এত বড় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে পারেন! মানুষ অবাধ্য নারীদের চেনে; কিন্তু তাদের অনেকেরই অবাধ্যতার পেছনের গল্প জানে না। অবাধ্যতার কারণে সে-ও অবশ্যই পাপী; সাধারণ পাপী নয়, বরং মহাপাপী। কিন্তু যে তাকে জোরপূর্বক অবাধ্য করে তুলেছে কিংবা নাটের গুরুর মতো পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে, সে যে-ই হোক না কেন, সে আরও বড় পাপী।

এখন যে মা-বাবারা বিয়ের পরও মেয়েকে ছোট ভেবে কিংবা ভালোবাসার আতিশয্যে তার ওপর পুরোপুরি প্রভাব বিস্তার করে রাখে, এবং আবেগের শিরোনামে মেয়েকে অবাধ্যতায় আক্রান্ত করে তোলে, তাদের নিজেদের আখিরাত সম্পর্কে ভাবা উচিত। তারা যদি নামাজি-রোজাদারও হয়, এরপরও এসব হাক্কুল ইবাদ নষ্ট করার কারণে আল্লাহর আদালতে কিছুতেই পার পাওয়ার কথা নয়; যদি না বান্দার ক্ষমা নসিবে জোটে।

আর যে নারীরা কারও কথা শুনে স্বামীর সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করে স্বাধীনচেতা হয়ে থাকতে চায়, তাদের আল্লাহর রাসুলের হাদিস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত :

لا تجد امرأة حلاوة الإيمان حتى تؤدي حق زوجها ولو سألها نفسها وهي على ظهر قَتَب

কোনো নারী ইমানের মিষ্টতা আস্বাদন করবে না, যতক্ষণ না সে স্বামীর হক আদায় করবে; যদিও স্বামী তাকে এমতাবস্থায় কামনা করে, যখন সে উটের হাওদার ওপর। (ইমাম হাইসামি ‘মাজমাউজ জাওয়ায়িদ’ গ্রন্থে (৪/৩০৯) বলেন, এই হাদিসের বর্ণনাকারী সকলে সহিহ’র বর্ণনাকারী।)

সুতরাং রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়লেই ইমানের মিষ্টতা অর্জিত হয়ে যায় না, দিনভর কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল থাকলে বা রাতদিন মিলিয়ে ১০/২০ হাজারবার তাসবিহ পাঠ করলেও ইমানের স্বাদ অর্জিত হবে না, যতক্ষণ না স্বামীর হক আদায় করে। এর আগে যদি ভেতরে কোনো স্বাদ অনুভব করেও, তবে স্মরণ রাখা উচিত, তা আসলে ইমানের স্বাদ নয়; বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা। শয়তানে এভাবে ধোঁকায় রেখে তার আখিরাত বরবাদ করতে চায়। হাদিসে তো স্পষ্ট বলাই হলো, নারী যদি প্রচণ্ড ব্যস্তও থাকে, এমনকি উটের হাওদার ওপরও থাকে, আর সে অবস্থায় স্বামী তাকে শুধু ডাকেইনি, বরং বিছানায়ও আহ্বান করেছে, এরপরও স্ত্রীর জন্য তৎক্ষণাতই তার আহ্বানে সাড়া দেওয়া অপরিহার্য। অন্যথায় সে হবে ইমানের স্বাদ থেকে বঞ্চিত এবং ইহকাল ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত। আজকাল তো মেয়েরা রান্নাঘরে কিছুসময় আগুনের সামনে থাকলেই আর স্বামীর ডাক শুনেও শুনতে চায় না, স্বামী কিছু বললে বা কোনো কিছু চাইলে উল্টো আরও বিরক্ত হয়। হায়, তারা যদি জানত, এই ছোট ছোট বিষয়গুলো আখিরাতের সফরে তাদের কতটা পেছনে ফেলে দিচ্ছে!

উল্লেখ্য, সমাজে এমন জিনিসের সংখ্যাও কম নয়, বাহ্যত যেগুলোকে নারীদের অবাধ্যতা মনে করা হয়, অথচ তা অবাধ্যতা নয়; বরং তার প্রাপ্য অধিকার। একইভাবে এমন জিনিসের তো কোনো শেষই নেই, যেগুলোকে অবাধ্যতা মনে করা হয় না, অথচ তা নিখাদ অবাধ্যতা। ‘নুশুজ’ বা অবাধ্যতা শুধু নারীদের থেকেই নয়; বরং পুরুষের থেকেও হয়। এ জন্য নারী যেমন ‘নাশিজা’ হয়; পুরুষও তেমনি ‘নাশিজ’ হতে পারে। আমরা আশা করি, আমাদের এ ধারাবাহিক আলোচনা প্রসঙ্গে ধীরে ধীরে সে বিষয়গুলোও উল্লেখিত হবে।

 

অবাধ্য নারী – ৫

 

একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা আল্লাহর বিধান মানার মধ্যে; যুক্তি কিংবা প্রবৃত্তির পূজা করার মধ্যে নয়। আল্লাহ যা হালাল করেছেন, মুমিন দ্বিধাহীন চিত্তে তা হালাল হিসেবে মেনে নেয়। আল্লাহ যা হারাম করেছেন, মুমিন নির্দ্বিধায় তা হারাম হিসেবে মেনে নেয়। এসব তার যুক্তিকে ধরুক কিংবা না ধরুক। এসব তার প্রবৃত্তির অনুকূল হোক কিংবা না হোক

একদিন আয়িশা রা. রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসুল,
نرى الجهاد أفضل الأعمال. أفلا نجاهد؟
আমরা তো দেখছি, জিহাদ হলো সর্বোত্তম আমল। তবে আমরা কি জিহাদ করব না?

রাসুলুল্লাহ সা. বলেন,
لا، ولكن جهادكن الحج.
না, তবে তোমাদের জিহাদ হলো হজ।

পুরুষের জন্য কিতাল কত কষ্টের! আল্লাহ নিজেই বলছেন, ‘তোমাদের ওপর কিতালকে ফরজ করা হয়েছে। অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়।’

কিতাল যে মানুষের কাছে কতটা অপছন্দনীয় এবং এ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ যে কতটা প্রচেষ্টারত, তা শুধু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেই নয়; বড় সংখ্যক মৌলবিদের ক্ষেত্রেও যথার্থ এবং দিবালোকের মতো স্পষ্ট। জিহাদের যে এত অপব্যাখ্যা, এর মূল কারণও এটাই। ভীতু এবং মুনাফিকরা চিরকালই তাই এতে অপব্যাখ্যার ধারা অব্যাহত রেখেছে।

যুক্তির দাবি হলো, জিহাদ যখন এত ফজিলতের বিষয়; নারীরা তবে কেন এর থেকে পিছিয়ে থাকবে? কিন্তু শরিয়ত তো যুক্তিপূজার নাম নয়। আল্লাহ এবং তার রাসুলের বিধান নারীদের ব্যাপারে ভিন্ন কিছু নির্দেশ করেছে, তাই তারা সাধারণভাবে রণাঙ্গনে নেমে সশস্ত্র লড়াই থেকে বিরত থাকবে। অন্যান্য সেক্টরের দীনি খেদমত আঞ্জাম দেবে।

ইবাদত মানেই হলো আল্লাহর জন্য চূড়ান্ত আনুগত্য এবং বিনয়। আল্লাহ যা বলেছেন, বিনা বাক্যব্যয়ে তার সামনে নির্দ্বিধ আত্মসমর্পণ। আল্লাহ নারীদের অন্যতম ইবাদত বানিয়েছেন স্বামীর আনুগত্যকে। এটা কঠিন হলেও কিতালের চাইতে কষ্টকর নয়। কারণ, এখানে সময় এবং শ্রম ব্যয় হলেও সম্পদ এবং জীবনোৎসর্গ হয় না। কিতালকেই যখন বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিতে হয়, আল্লাহর ডাকে সাত সাগর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে রৌদ্রময় দিনে মরুর দেশে হজ করতে হয়, স্বামীর আনুগত্যের ক্ষেত্রে তা তো আরও বেশি প্রযোজ্য হওয়ারই কথা।

শুধু নারীরাই যে পুরুষের খেদমত করে, বিষয়টা তা নয়। পুরুষরা দিনভর কায়িক পরিশ্রম করে নারীদের আর্থিক খেদমত করে, আর নারীরা তাদের জন্য ঘরোয়া খেদমত আঞ্জাম দেয়। একজন সামলায় ঘর, একজন সামলায় বাহির। নারীর তুলনায় পুরুষের শ্রম, মেধা ও সময় ব্যয়িত হয় অনেক বেশি। একজন নারীর জন্য পুরুষ তার জীবনটাকে উৎসর্গ করে রাখে, তার উপস্থিতিতে নারীকে আর আলাদা করে কোনো কিছু ভাবতে হয় না। তো এসব কারণে নারী তার ঘরটুকু অন্তত সামলে রাখবে এবং তার বাবুদের যত্ন নেবে, এটা খুব বড় কোনো বিষয় নয়। তা ছাড়া বাবুরা তো শুধু স্বামীর নয়; তারও। এগুলো কোনোটা কোনোটার বিনিময় নয়। উভয়ের যৌথ সাধনায় পূর্ণতা পায় একটা সংসার। এর কোথাও ত্রুটি থাকলে সংসারও ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়।

আল্লাহ নারীর ওপর স্বামীর একান্ত আনুগত্য অপরিহার্য করেছেন, এটা নারীদের জন্য স্বামীর দাসত্ব নয়; বরং এটা তাদের জন্য আল্লাহরই দাসত্ব। তারা তাদের স্বামীদের ওপর কোনো করুণাও করছে না; বরং তারা সেরেফ আল্লাহর বিধান পালন করছে। আল্লাহ যার ওপর যা অবধারিত করেন, সে তা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিলেই কেবল পাবে ইহকাল এবং পরকালে শান্তি ও মুক্তি।

মুসা আ.-এর উম্মতের ওপর আল্লাহ কিসাস ফরজ করেছিলেন। ইসা আ.-এর উম্মতের ওপর তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করাকে অপরিহার্য করেছিলেন। তো এগুলো মৌলিকভাবে কোনো কিছুই নয়। মুসলমানের সফলতা সেরেফ আল্লাহর বিধান মানার মধ্যে। বিধান যে সময়ে যা-ই হোক এবং যেমনই হোক। এ জন্য রাসুলের হিজরতের পর যখন মুসলমানদের কিবলা মসজিদে হারামের পরিবর্তে মসজিদে আকসাকে নির্ধারণ করা হয় তখন অনেক মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করে কাফির হয়ে গিয়েছিল। তারা কিবলা পরিবর্তনের বিষয়টা মেনে নিতে পারছিল না। আল্লাহ বলেন, ‘আমি এই বিধান দিয়েছিলাম, যেন আমি যারা উল্টো পায়ে পেছনে ফিরে যায় তাদের থেকে আলাদা করে জানতে পারি, কারা রাসুলের অনুসরণ করে।’

জিহাদের বিধানের ব্যাপারেও তিনি বলেন, ‘এ বিধান তিনি দিয়েছেন, যাতে তিনি মুমিনদের জানতে পারেন এবং জানতে পারেন ওই সব লোকদের, যারা নিফাকে আক্রান্ত হয়েছে।’

নারীদের জন্য স্বামীর আনুগত্যের বিষয়টিও এমন। তারা স্বামীর একান্ত অনুগত থাকবে। কেন? কারণ, আল্লাহ এবং তার রাসুল নির্দেশ দিয়েছেন। এখন এর ওপর কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা, এই বিধানের ব্যাপারে অভিযুগের সুর তোলা কিংবা আল্লাহর ব্যাপারে একধরনের অসন্তুষ্টি জাহির করা বড় খতরনাক; যা ইমানের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

আজকাল দীনদার নারীরাও নিজেদের অজান্তে অনেক সময় অনুযোগের সুরে কথা বলে। বোঝা যায়, তারা আল্লাহর এই বিধানকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। তাই সময়ে সময়ে ভেতরে বেদনার অনুরণন বাজে। তাকদিরের প্রতি মনোবেদনা প্রকাশ করে আনুগত্য তো করে যায়; কিন্তু ভেতরে একধরনের অনুতাপ, অনুশোচনা ও অনুযোগ থেকেই যায়। এ বিষয়গুলো যে সূক্ষ্ম নিফাক, তা খুব কম মানুষই জানে।

আল্লাহ এবং তার রাসুলের প্রতিটা বিধানকে মনোতুষ্টির সঙ্গে, আন্তরিক সন্তুষ্টি ও ভালোবাসার সঙ্গে, নিঃসঙ্কোচে নির্দ্বিধায় এবং কোনোপ্রকার অনুযোগ-অনুতাপ ছাড়াই যারা গ্রহণ করে, একমাত্র তারাই মুমিন, তারাই আল্লাহ এবং তার রাসুলের একনিষ্ঠ অনুসারী। আমি অনেক দীনদার নারীকেও ‘নারী হওয়ার অনুতাপ’ করতে দেখেছি। তাকদিরের প্রতি অস্পষ্ট অনুযোগ করে ‘বাধ্যতাপূর্বক (অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত নয়) ‘স্বামীর আনুগত্য’ করতে দেখেছি। এ বিষয়গুলো নারীদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের বরবাদির কারণ।

Share This