প্রশ্ন :

আমাদের ৩০ বছর পূর্বের সংস্কারহীন জরাজীর্ণ মসজিদটি ভেঙ্গে বহুতলবিশিষ্ট মসজিদ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন ওই মসজিদের নিচ তলায় মার্কেট ও উপর তলায় মসজিদ করায় শরীয়তে কোনো বাধা আছে কি? ইতিপূর্বে নিচের ফতোয়াটি আমাদের হস্তগত হয়েছে। কিন্তু এলাকাবাসী এ ফতোয়ার সঙ্গে একমত হতে পারেনি। তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে আলোচ্য বিষয়ের সমাধান কিছুটা বিস্তারিতভাবে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।

যে কারণে এ ফতোয়া

 

উত্তর :

প্রশ্নোক্ত মাসআলাটির সমাধান ভালোভাবে অনুধাবন করার জন্য আমরা এ বিষয়ে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করা সংগত মনে করছি। নিচে পয়েন্ট আকারে পুরো বিষয়টি উল্লেখ করা হলো :

  1. ইসলামে মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন ও হাদীসে মসজিদের জায়গাকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। শরয়ী মসজিদ হওয়ার জন্য শরীয়তে জমি ওয়াকফি হওয়ার শর্তারোপ করা হয়েছে। যে জায়গা ওয়াকফি হবে না, তা শরয়ী মসজিদ হিসেবে ধর্তব্য হবে না। {দ্রষ্টব্য : হিদায়া : ২/৬৪৪; ফাতহুল কাদীর : ৬/২১৭}
  2. কুরআন ও সহীহ হাদীসে মসজিদসমূহকে আল্লাহ তাআলার দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে। কুরআনে এসেছে :

وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ

অর্থ : নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর। {সূরা জিন : ১৮}

সহীহ হাদীসে এসেছে :

مَنْ بَنَى لِلَّهِ مَسْجِدًا بَنَى اللَّهُ لَهُ مِثْلَهُ فِي الجَنَّةِ

অর্থ : যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর নির্মাণ করবেন। {সুনানুত তিরমিযী : ৩১৮। ইমাম তিরমিযী r বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।}

অপর এক হাদীসে এসেছে :

الْمَسَاجِدُ بُيُوتُ اللهِ فِي الْأَرْضِ تُضِيءُ لِأَهْلِهَا كَمَا تُضِيءُ نُجُومُ السَّمَاءِ لِأَهْلِ الْأَرْضِ

অর্থ : পৃথিবীতে মসজিদসমূহ আল্লাহর ঘর। তা আকাশবাসীদের আলো দান করে, যেমনিভাবে আকাশের তারকারাজি পৃথিবীর অধিবাসীদের আলো দান করে। {আল-মু‘জামুল কাবীর, তাবারানী : ১০৬০৪৮। ইমাম হাইসামী r মাজমাউয যাওয়ায়িদ (৫/৮) গ্রন্থে বলেন, হাদীসের বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত।}

সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি মুসলিম সর্বসাধারণের নামাজ আদায়ের জন্য কোনো জায়গা ওয়াকফ করে, তাহলে তা সম্পূর্ণ তার মালিকানা থেকে বের হয়ে যায় এবং চিরকালের জন্য আল্লাহ তাআলার জন্য, মসজিদ হিসেবে সুনির্ধারিত হয়ে যায়। সুতরাং কোনো অবস্থায়ই ওয়াকফ প্রত্যাহার করা কিংবা সে জায়গাকে অন্য কাজে লাগানো বৈধ নয়। {আল-মাবসূত, সারাখসী : ১২/৩৪}

  1. মসজিদের জন্য কোনো জায়গা ওয়াকফ করা হলে সেই জায়গার ভূমি থেকে আকাশ পর্যন্ত পুরো জায়গাটিই মসজিদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইমাম ফখরুদ্দীন যায়লায়ী r বলেন, ‘মসজিদের ছাদও আকাশ পর্যন্ত মসজিদ। এ জন্য কোনো ব্যক্তি যদি মসজিদের ছাদ থেকে মসজিদের ভেতরের কোনো ব্যক্তির ইকতিদা করে, তাহলে তার ইকতিদা সহীহ হয়ে যাবে, যদি সে ইমামের চাইতে সামনে না দাঁড়ায়। এ ছাড়াও মসজিদের ছাদে ওঠার দ্বারা ইতিকাফ ভঙ্গ হয় না। গোসল ফরজ হওয়া ব্যক্তি, ঋতুমতী কিংবা সন্তান জন্মদান-পরবর্তী রক্তস্রাববিশিষ্টা নারীদের জন্য মসজিদের ছাদে অবস্থান করা বৈধ নয়।’ {তাবয়ীনুল হাকায়িক : ১/৪১৯। আরও দ্রষ্টব্য : ফাতহুল কাদীর : ১/৪৩৪; আদ-দুররুল মুখতার : ২/৫১৬; ফাতাওয়া শামী : ২/৫১৭}
  2. মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জায়গাকে যেহেতু আল্লাহ তাআলার জন্য পুরোপুরি উৎসর্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই সেই জায়গাকে বিক্রয় বা পরিবর্তন করার কোনো অবকাশ থাকে না। ইমাম বুরহানুদ্দীন মারগীনানী r বলেন, ‘কেউ তার জমিতে মসজিদ নির্মাণ করলে সে আর তা প্রত্যাহার করতে পারবে না এবং উক্ত জমিকে বিক্রয়ও করতে পারবে না এবং সে মারা গেলে তার ওয়ারিসও তা মীরাস হিসেবে পাবে না। কারণ, তা বান্দার হক থেকে বের হয়ে নিরঙ্কুশভাবে আল্লাহ তাআলার জন্য হয়ে গেছে। সকল বস্তুই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন। মানুষ সাময়িকভাবে এতে অধিকার লাভ করে। যখন সে তার এ অধিকার প্রত্যাহার করে নেয়, তখন তা আপন অবস্থায় (আল্লাহর মালিকানায়) ফিরে যায় এবং তাতে হস্তক্ষেপের কোনো অধিকার তার জন্য বাকি থাকে না। যেমনটি দাস মুক্ত করার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।’ {আল-হিদায়া : ২/৬৪৫}

মসজিদের জন্য ওয়াফকৃত জায়গাকে যে বিক্রয় বা পরিবর্তন করা যাবে না, এটা শুধু হানাফী মাযহাবের ফতোয়াই নয়; বরং অধিকাংশ ইমামই এ ফতোয়া দিয়েছেন। {হানাফী মাযহাবের ফতোয়া জানার জন্য দ্রষ্টব্য : আহকামুল ওয়াকফ : ৯৪; ফাতহুল কাদীর : ৬/২৮৮; ফাতাওয়া শামী : ৪/৩৮৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ২/৪০১; আল-মুহীতুল বুরহানী : ৬/২৩৩। মালেকী মাযহাবের ফতোয়া জানার জন্য দ্রষ্টব্য : আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী : ১/১৬১, ১৬৫; আল-কাওয়ানীনুল ফিকহিয়্যা : ২৪৪; আল-খিরাশী : ৭/৯৫; আশ-শারহুল কাবীর : ৪/৯১; হাশিয়াতুস সাওয়ী আলাশ শারহিস সাগীর : ৪/১২৬-১২৭। শাফেয়ী মাযহাবের ফতোয়া জানার জন্য দ্রষ্টব্য : মুগনিল মুহতাজ : ২/৩৯২; আল-বায়ান ফী মাযহাবিল ইমাম শাফেয়ী : ৮/৯৯। হাম্বলী মাযহাবের ফতোয়া জানার জন্য দ্রষ্টব্য : আল-ফুরু : ৬২২; আল-ইনসাফ : ৭/১০১।}

কেউ কেউ উমর রা.-এর একটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে মসজিদের জায়গা স্থানান্তর বা পরিবর্তন করাকে বৈধ সাব্যস্ত করতে চায়। কিন্তু কয়েকটি কারণে এটাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে মসজিদের জায়গা স্থানান্তর বা পরিবর্তন করাকে বৈধ সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই :

ক. উমর রা.-এর ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে তাবারানী r-এর আল-মু‘জামুল কাবীর গ্রন্থে, হাদীস নম্বর : ৮৯৪৯। তিনি ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন তার উস্তাদ আলী ইবনু আবদুল আযীয সূত্রে। তিনি বর্ণনা করেছেন আবু নুয়াইম সূত্রে। তিনি বর্ণনা করেছেন মাসউদী সূত্রে। তিনি বর্ণনা করেছেন কাসিম সূত্রে। কাসিম সরাসরি বর্ণনা করেছেন তার দাদা আবদুল্লাহ সূত্রে। অথচ হাদীস বিশারদদের মতানুসারে কাসিম তার দাদার থেকে সরাসরি কোনো বর্ণনা শোনেননি। সুতরাং এ বর্ণনাটির সূত্র বিচ্ছিন্ন। আর বিচ্ছিন্ন বর্ণনা হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা অনুযায়ী যয়ীফ তথা দুর্বল হিসেবে অভিহিত হয়। কোনো ইমামই সরাসরি এ হাদীসটিকে বিশুদ্ধ বলেননি। ইমাম হাইসামী r বলেন, ‘কাসিম তার দাদার থেকে কোনো বর্ণনা শোনেননি। আর এই বর্ণনার বর্ণনাকারীগণ সহীহ গ্রন্থের বর্ণনাকারী।’ {মাজমাউয যাওয়ায়িদ : ১০৬৫৪} এখানে তার কথার প্রথম অংশ দ্বারাই বর্ণনাটির দুর্বলতা প্রমাণিত হয়। আর দ্বিতীয় অংশ দ্বারাও হাদীসটি বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হয় না। কারণ, তার কথার দ্বিতীয় অংশের অর্থ হলো, সহীহ গ্রন্থের লেখকগণ (যেমন : ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম প্রমুখ) এ সকল বর্ণনাকারী থেকে হাদীস নিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা এঁদের থেকে হাদীস নেওয়ার দ্বারাই এ সকল বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত সকল হাদীস, যা সহীহ গ্রন্থ ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, বিশুদ্ধ হয়ে যাওয়া আবশ্যক নয়। উদাহরণস্বরূপ : এখানে একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন নুয়াইম। যিনি আল-ফিতান নামক একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি সহীহ বুখারীসহীহ মুসলিম গ্রন্থের বর্ণনাকারী হওয়া সত্ত্বেও তার নিজের গ্রন্থে অসংখ্য জাল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা স্থান পেয়েছে। সুতরাং এই ঘটনার বর্ণনাকারীগণ সহীহ গ্রন্থের বর্ণনাকারী হওয়ার দ্বারাই তা বিশুদ্ধ হয়ে যাওয়া আবশ্যক নয়। আর হাইসামী r-এর কথার প্রথমাংশের দ্বারাই তো বর্ণনাটির দুর্বলতা স্পষ্ট প্রমাণিত হয়।

খ. উমর রা.-এর ঘটনাটিকে বিশুদ্ধ ধরা হলেও তা দ্বারা মসজিদের জায়গা স্থানান্তর বা পরিবর্তনের বৈধতা প্রমাণিত হয় না। কারণ, পুরো বর্ণনাটিকে বিশ্লেষণ করলে সেখান থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় না যে, তা একটি শরয়ী মসজিদ ছিল। কেননা পুরো বর্ণনায় এমন কথা নেই যে, সা‘দ ইবনু মালিক h সেই জায়গাকে ওয়াকফ করেছিলেন। কোনো জায়গা ওয়াকফি না হলে তা শরয়ী মসজিদ হিসেবে বিবেচিত হয় না, তবে সেখানে ওয়াক্তিয়া নামাজ বিশুদ্ধ হয়ে যায়। যেকোনো সময় তা স্থানান্তর, পরিবর্তন, এমনকি বিক্রিও করা যায়। সুতরাং স্পষ্ট দলীল এবং চার মাযহাবের অধিকাংশ ইমামের ফতোয়া থাকার পরও একটি দুর্বল এবং ভিন্ন অর্থের সম্ভাবনাপূর্ণ বর্ণনার ওপর আমল করার অবকাশ নেই।

গ. উমর রা.-এর ঘটনাটি একটি অতি প্রয়োজনে মসজিদ স্থানান্তর করা প্রসঙ্গে। আর এখানে প্রশ্ন মসজিদ স্থানান্তর করা নিয়ে নয়; বরং শুধু মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জায়গার একটি অংশে মার্কেট নির্মাণ প্রসঙ্গে। সুতরাং একটির ওপর অন্যটিকে কিয়াস (তুলনা) করাও যথার্থ নয়।

অতএব প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে পুরোনো মসজিদের জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে নিচে মার্কেট এবং উপরে মসজিদ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

 

 

Share This