দীন যদি যুক্তিনির্ভরই হতো তাহলে মোজার ওপর মাসেহ না করে নিচ মাসেহ করাই সংগত ছিল। অথচ রাসুলুল্লাহ সা. মোজার ওপরের অংশ মাসেহ করতে বলেছেন। (আলি রা.’র কথা)

দীন ভক্তিনির্ভর, যুক্তিনির্ভর নয়। যদি দীন যুক্তিনির্ভর হতো তাহলে উদাহরণস্বরূপ : সফরে কসর করার যুক্তি হলো, কষ্ট। এখন দেখা যাচ্ছে, ঢাকা থেকে যশোর যাওয়ার চাইতে উত্তরা থেকে গুলিস্তান যাওয়া অধিক কষ্টকর। কিন্তু প্রথমটিতে কসর ওয়াজিব হলেও দ্বিতীয়টিতে কসর জায়িযই নয়।

ইসলামের যুদ্ধগুলোতেও কার্যকর রয়েছে এ নীতি। জনবল এবং অস্ত্রবল দিয়ে মুসলিমরা কখনোই বিজয় লাভ করেনি। যখন তাদের ভক্তি মজবুত ছিল, তখন জনবল অস্ত্রবল ছাড়াই তারা বিজয় লাভ করেছে। যার উদাহরণ হলো, বদর এবং অন্যান্য গাযওয়া। পক্ষান্তরে যখন যুক্তি তাদের ভেতড় গেড়ে বসেছে তখন তারা পরাজয়ের শিকার হয়েছে। নবি-জীবনের হুনাইনের ঘটনাই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

এ যুগেও মুসলিমদের দৃষ্টি জনবল এবং অস্ত্রবলের দিকে তাই তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত, আলওয়াহানে আক্রান্ত এবং ইমান আনয়নের পর উম্মাহর সবচে বড় ফরজ ইসলামের ভূমি পুনরুদ্ধার এবং ইসলামি শাসন-বিচারব্যবস্থা ত্যাগের ভয়াবহ গুনাহে পুরো জাতি আক্রান্ত; এমনকি এর স্মরণ-আলোচনাও আজ মরে গেছে। প্রত্যেকে নিজের কাছে যা রয়েছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট। ‘কুল্লু হিযবিন বিমা লাদাইহিম ফারিহুন’।

অন্ধবিশ্বাস শব্দটা এখন গালি হয়ে গেলেও এটাই মুসলিমদের বাস্তব অবস্থা। আমরা অন্ধবিশ্বাসীই বটে। যুক্তি কী বলল, তা মোটেও মুখ্য নয়; স্রষ্টা কী বললেন, তা-ই লক্ষণীয়। স্রষ্টার নির্দেশ-নির্দেশনার সামনে যুক্তিকে কুরবানি দিলেই কাউকে মুসলিম বলা যেতে পারে। নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মরণ সবই জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।

এ কারণেই আলিমরা মানুষের সামনে অধিক পরিমাণে হিকমাতের আলোচনা করাকে অপছন্দ করেন। উসুলুল ফিকহের স্বীকৃত নীতি হলো, বিধানের ভিত্তি ইল্লাতের ওপর, হিকমাতের ওপর নয়।

হাঁ, যারা সংশয়গ্রস্ত এবং রোগী, তাদের সংশয় দূর করার জন্য এবং রোগের উপশম করার জন্য তাদের যুক্তি শোনানো যেতে পারে। যুক্তিগুলো পথ্যের মতো। সুস্থ মানুষের এসবের পেছনে পড়ে অযথা নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার অর্থ নেই।

তা ছাড়া যুক্তিগুলো মানুষের অপূর্ণ মস্তিষ্ক-বিবেকের সৃষ্টি। অর্থাৎ এর উৎপত্তিস্থল হলো মানব-মস্তিষ্ক। পক্ষান্তরে বিধানগুলো খোদ মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত। আর তার সকল বিধানই প্রজ্ঞাপরিপূর্ণ। বান্দা তার অপূর্ণ মস্তিষ্ক দিয়ে স্রষ্টার প্রজ্ঞাপরিপূর্ণ বিধানের হেতু উদ্ধার করতে সিকিভাগের বেশি সক্ষম হবে না, এটাই স্বাভাবিক। এবং এ ক্ষেত্রে সক্ষম না হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। ‘নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বলরূপে।’ ‘তোমাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে অতি স্বল্প পরিমাণে।’

এ কারণেই দেখা যায়, আল্লাহ যেসব বিষয়কে অস্পষ্ট রেখেছেন, সেগুলো পেছনে যারা পড়ে দিনশেষে তারা উদ্ভ্রান্ত এবং বিভ্রান্তই হয়। আল্লাহ ‘মুতাশাবিহাতের’ পেছনে পড়তে না করেছেন। যারা এসবের পেছনে পড়ে তাদের অন্তর বক্র হয়ে যায়। ‘তাকদির’ তথা ভাগ্যলিপির বিষয়টি আল্লাহ অস্পষ্ট রেখেছেন, রাসুলও স্পষ্ট করে যাননি, এমনকি সাহাবিরাও স্পষ্ট করতে পারেননি। আলি রা. বলছেন, ‘লাইলুন মুজলিমুন লা তাসলুকহু। বাহরুন আমিকুন লা তালিজহু। সিররুল্লাহি কাদ খাফিয়া আলাইকা ফা লা তাফতিশহু।’

وسأل رجل علي بن أبي طالب رضي الله عنه فقال أخبرني عن القدر قال : طريق مظلم لا تسلكه ، وأعاد السؤال فقال : بحر عميق لا تلجه ، وأعاد السؤال فقال سر الله قد خفي عليك فلا تفتشه. (شرح السنة ــ ج 6 ص 278 ط دار الفكر )

তিরমিজির হাদিসটিও উত্তম পথিনির্দেশিকা :

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : خرج علينا رسول الله صلى الله عليه وسلم ونحن نتنازع في القدر فغضب حتى احمر وجهه حتى كأنما فقئ في وجنتيه الرمان فقال ( أبهذا أمرتم ؟ أم بهذا أرسلت إليكم ؟ إنما هلك من كان قبلكم حين تنازعوا في هذا الأمر ، عزمت عليكم ألا تتنازعوا فيه )

“আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোনো একসময় আমাদের সামনে এসে দেখলেন যে, আমরা তাকদির বিষয়ক তর্কে-বিতর্কে লিপ্ত হয়েছি। তিনি ভীষণ রাগান্বিত হলেন, এতে তাঁর মুখমন্ডল এমন লালবর্ণ ধারণ করল, যেন তাঁর দুই গালে ডালিম নিংড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারপর তিনি বললেন, তোমরা কি এ জন্য আদেশপ্রাপ্ত হয়েছ, না আমি তোমাদের প্রতি এটা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি? এ বিষয়ে তোমাদের পূর্ববর্তী জনগণেরা যখনই বাক-বিতন্ডা করেছে তখনই তারা ধ্বংস হয়েছে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে তোমাদের বলছি, তোমরা এ বিষয়ে কখনো যেন বিতর্কে লিপ্ত না হও।”

তারা সকলে এর ওপর ‘ইজমালি ইমান’ রেখেছেন। এখন অল্প কথায় তাকদিরকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়; যার ওপর নাকি কোনো সংশয়-সন্দেহ-আপত্তি বাকি থাকে না। পুরো বিষয়টা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে যায়। হাঁ, হবে না বৈ কি! কেউ ধরেছে জাবরিয়্যাদের পথ আর কেউ ধরেছে কাদারিয়্যাদের পথ; যাদের ব্যাপারে রাসুল সা. বলেছেন, ‘আলকাদারিয়্যা মাজুসু হাযিহিল উম্মাহ।’ কাদারিয়্যারা হলো এই উম্মাহর অগ্নিপূজক সম্প্রদায়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর ব্যাখ্যানুসারে আলোচনা এগোলে এ নিয়ে খুব বেশি দূর এগোনো যাবে না, এটাই স্বাভাবিক। এরপরও ইমান রাখতে হবে; কারণ, দীন যুক্তিনির্ভর নয়, বরং ভক্তিনির্ভর।

আজ উম্মাহর অধঃপতনের অন্যতম কারণ হলো, স্রষ্টা এবং তার প্রেরিত দূতের নির্দেশ-নির্দেশনার ওপর মানব-মস্তিষ্কের অপূর্ণ বা অসাড় যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, শরিয়াহ অনুসরণের পরিবর্তে ব্যক্তির অনুসরণকেই অগ্রগণ্য মনে করা হয়। যার দরুন ব্যক্তি হোঁচট খেলে তার অনুসারীরাও চোখ বুজেই হোঁচট খায়। অথচ শরিয়াহ তো এমন, যা কখনোই হোঁচট খাওয়ার নয়, যা কখনোই সেকেলে বা অচল হয়ে যায় না।

Share This