মানুষ চাইলেও একা থাকতে পারে না। এটা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খায় না। মানুষ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে ভালোবাসে। সে সমাজে বাস করে স্বাভাবিক বোধ করে। কিন্তু মানুষের সমাজে বাস করতে হলে কোনো নিয়মের অধীন হয়ে বাস করতে হয়। নির্দিষ্ট কোনো অনুশাসন ও আইনকানুনের অনুগত হয়ে চলতে হয়। অন্যথায় সমাজ তার শৃঙ্খলা হারায়। সমাজে ফ্যাসাদ বিস্তার লাভ করে। মানুষের এই কল্পিত স্বাধীনতা রূপ নেয় স্বেচ্ছাচারিতায়। আর প্রত্যেক স্বেচ্ছাচারিতাই দুর্ঘটনার কারণ হয়।

পথের গাড়িগুলো কী সুন্দর শৃঙ্খল হয়ে গতির সঙ্গে সামনের দিকে এগোতে থাকে। এখন কোনো গাড়ি যদি স্বাধীনতার নামে সেই নীতি থেকে নিজেকে আলাদা মনে করে। সে একই রোড ধরে অন্য গাড়িগুলোর কথা বিবেচনা না করে মাঝ দিয়ে ঠিক উল্টো পথে চলতে শুরু করে বা পথের মধ্যে আড়াআড়ি করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তার একার এই স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সবাই কিন্তু জটিলতায় পড়বে। ট্রাফিক তার শৃঙ্খলা হারাবে। একজনের স্বাধীনতা ভোগ সবাইকে করে তুলবে অতিষ্ঠ।

কোনো সমাজে ব্যক্তিবিশেষের স্বেচ্ছাচারিতাই যখন অন্যদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের গতি ব্যাহত করে, তাহলে যে সমাজে সবাই বা অধিকাংশ মানুষ স্বেচ্ছাচারী, সে সমাজ তো নির্ঘাত অচল হয়ে যেতে বাধ্য। সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায়ই বলা যায়, আনুগত্যমুক্ত স্বাধীনতা আদতে কোনো স্বাধীনতা নয়; বরং তা নিরেট স্বেচ্ছাচারিতা।

তো মানুষকে সমাজে চলতে গেলে কোনো অনুশাসন ও আইনকানুনের অনুগত হয়েই চলতে হবে। কিন্তু কথা হলো, মানুষ কোন অনুশাসন ও আইনকানুনের অনুগত হবে? কিসের অনুগত হলে প্রকৃত স্বাধীনতা ভোগ করা যাবে?

এই অনুশাসন ও আইনকানুনের উৎস যদি হয় মানবরচিত বা মানবের হাতে বিকৃতিপ্রাপ্ত কোনো ধর্ম, তাহলে সাধারণ মানুষজন ভণ্ড ধর্মযাজকদের দাসে পরিণত হবে। মানবতা হবে মানুষের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। আর স্পষ্ট যে, মানবরচিত বা মানবের হাতে বিকৃতিপ্রাপ্ত ধর্ম কখনো মানুষকে মহা সত্যের সন্ধান দিতে পারে না। পারে না ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত মানবতাকে উদ্ধার করতে। অপরদিকে মানুষ যদি ভণ্ড ধর্মযাজকদের দাসত্ব থেকে বাঁচতে গিয়ে ধর্মমুক্ত আইনসভাকে আইনের উৎস বানিয়ে ফেলে, তাহলে সাধারণ মানুষজন শাসকশ্রেণির দাসে পরিণত হবে। রাষ্ট্র নামক অস্তিত্বহীন সত্তার আড়ালে, এক কল্পিত সর্বেসর্বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের শিরোনামে শাসকশ্রেণির সার্বভৌমত্বের উদ্দেশে অনুগত হতে বাধ্য হবে।

গোটা পৃথিবী যার নিয়মের অধীন, সেই মহান প্রতিপালকের দেওয়া স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকেও তাঁরই নিয়মনীতির অধীন বানিয়ে নেওয়াই হলো স্বভাবজাত আচরণ। কিন্তু মানুষ যখন এতে সম্মত হয় না, বরং সে মানবরচিত বা মানবের হাতে বিকৃতিপ্রাপ্ত কোনো ধর্মের নামে অথবা আল্লাহর শাসনকে সরাসরি অস্বীকার করে ধর্মমুক্ত আইনসভায় মানবের অসম্পূর্ণ মস্তিষ্কপ্রসূত বিধিবিধানের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তখন অন্য সকল মানুষ এসকল যাজক ও শাসকগোষ্ঠীর দাস হয়ে যায়; যদিও বিভিন্ন লেভেল লাগিয়ে এই সত্যকে আড়াল করার সর্বাত্মক চেষ্টাই করা হয়।

Share This